সন্ধি অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৫ম খণ্ড

সন্ধি অধ্যায়

 সন্ধি অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

Table of Contents

সন্ধি অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৫২৭ – ইমাম মিমাংসার নির্দেশ দেওয়ার পর তা অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ফয়সালা দিতে হবে।

হাদীস নং ২৫২৭

আবুল ইয়ামান রহ………..যুবাইর রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি এক আনসারীর সাথে বিবাদ করেছিলেন, যিনি বদরে শরীক ছিলেন। তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে পাথরী যমীনের একটি নালা সম্পর্কে অভিযোগ করলেন। তারা উভয়ে সে নালা থেকে পানি সেব করতেন।

তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবাইরকে বললেন, হে যু্বাইর! তুমি প্রথমে পানি সেচবে। তারপর তোমার প্রতিবেশীর দিকে পানি ছেড়ে দিবে। আনসারী তখন রেগে গেল এবং বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! সে আপনার ফুফুর ছেলে বলে (এ বিচার) ?

এতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর চেহারার রং বদলে গেল। তারপর তিনি বললেন, তুমি সেচ কর, তারপর পানি আটকে রাখ, বেষ্টনীর বরাবর পৌঁছা পর্যন্ত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবাইর রা.-কে তার পূর্ণ হক দিলেন।

এর আগে যুবাইর রা.-কে তিনি এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন যা আনসারীর জন্য সুবিধাজনক ছিল। কিন্তু আনসারী নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রাগান্বিত করলে সুস্পষ্ট নির্দেশের যুবাইর রা.-কে তিনি তার পূর্ণ হক দান করলেন।

উরওয়া রা. বলেন, যুবাইর রা. বলেছেন, আল্লাহর কসম! আমার নিশ্চিত ধারণা যে (আল্লাহর বাণী) : কিন্তু না, আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ তারা তাদের নিজেদের বিবাদ বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পন না করে (৪: ৬৫) আয়াতটি সে ব্যাপারেই নাযিল হয়েছিল।

বুখারি হাদিস নং ২৫১১ – মানুষের মধ্যে আপোস-মিমাংসা করে দেওয়া।

হাদীস নং ২৫১১

সাঈদ ইবন আবু মারয়াম (রহঃ)……..সাহল ইবন সা‘দ (রা) থেকে বর্ণিত যে, আমর ইবন আওফ গোত্রের কিছু লোকের মধ্যে সামান্য বিবাদ ছিল। তাই নাবী (সাঃ) . তাঁর সাহাবীগণের একটি জামায়াত নিয়ে তাদের মধ্যে আপস-মিমাংশা করে দেওয়ার জন্য সেখানে গেলেন। এদিকে সালাতের সময় হয়ে গেল।

কিন্তু নাবী (সাঃ) . মসজিদে নববীতে এসে পৌছেন নি। বিলাল (রা- সালাতের আযান দিলেন, কিন্তু নাবী (সাঃ) . তখনও এসে পৌঁছেন নি। পরে বিলাল (রা) আবূ বকর (রা)-এর কাছে এসে বললেন, নাবী (সাঃ) . কাজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এদিকে সালাতেরও সময় হয়ে গেছে।

আপনি সালাতে লোকদের ইমামতি করবেন? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি যদি ইচ্ছা কর।’ তারপর বিলাল (রা) সালাতের ইকামত বললেন, আর আবূ বকর (রা) এগিয়ে গেলেন। পরে নাবী (সাঃ) . এলেন এবং কাতারগুলো অতিক্রম করে প্রথম কাতারে এসে দাঁড়ালেন। (তা দেখে) লোকেরা হাততালি দিতে শুরু করল এবং তা অধিক মাত্রায় দিতে লাগলেন।

আবু বকর (রা) সালাত অবস্থায় কোন দিকে তাকাতেন না, কিন্তু (হাততালির কারণে) তিনি তাকিয়ে দেখতে পেলেন যে, নাবী (সাঃ) . তাঁর পেছনে দাঁড়িয়েছেন। নাবী (সাঃ) . তাঁকে হাতের ইশারায় আগের ন্যায় সালাত আদায় করতে নির্দেশ দিলেন। আবু বকর (রা) তাঁর দু’হাত উপরে তুলে আল্লাহর হামদ বর্ণনা করলেন।

তারপর কিবলার দিকে মুখ রেকে পেছনে ফিরে এসে কাতারে শামির হলেন। তখন নাবী (সাঃ) . আগে বেড়ে লোকদের ইমামত করলেন এবং সালাত সমাপ্ত করে লোকদের দিকে ফিরে বললেন, ‘হে লোক সকল! সালাত অবস্থায় তোমাদের কিছু ঘটলে তোমরা হাততালি দিতে শুরু কর।

অথচ হাততালি দেওয়া মহিলাদের কাজ। সালাত অবস্থায় কারো কিছু ঘটলে সে যেন সুবাহান্নাল্লাহ বলে। কেননা এটা মুনলে তার দিকে দৃষ্টিপাত না করে পারতো না।

’ ‘হে আবু বকর! তোমাকে যখন ইশারা করলাম, তখন সালাত আদায় করাতে তোমার কিসের বাধা ছিল?’ তিনি বললেন, ‘আবূ কূহাফার পুত্রের জন্য শোভা পায় না নাবী (সাঃ) . -এর সামনে ইমামত করা।

 সন্ধি অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৫১২

হাদীস নং ২৫১২

মুসাদ্দাদ রহ……….আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলা হল, আপনি যদি আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের কাছে একটু যেতেন । নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে যাওয়ার জন্য গাধায় আরোহণ করলেন এবং মুসলিমগণ তাঁর সঙ্গে হেটে চলল। আর সে পথ ছিল কংকরময়।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এসে পৌঁছলে সে বলল, সরো আমার সম্মুখ থেকে । তোমার গাধার দুর্গন্ধ আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। তাদের মধ্য থেকে একজন আনসারী বলল, আল্লাহর কসম ! নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গাধা সুগন্ধে তোমার চাইতে উত্তম।

আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-এর গোত্রের এক ব্যক্তি রেগে উঠল এবং উভয়ে একে অপরকে গালাগালি করল। এভাবে উভয়ের পক্ষের সঙ্গীরা ক্রুব্ধ হয়ে উঠল এবং উভয় দলের সাথে লাঠালাঠি, হাতাহাতি ও জুতা মারামারি হল।

আমাদের জানান হয়েছে যে, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হল : “মুমিনদের দু’দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মিমাংসা করে দিবে” (৪৯ : ৯) আবু আবদুল্লাহ রহ. বলেন, মুসাদ্দাদ রহ. বসার এবং হাদীস বর্ণনার পূর্বে আমি তার থেকে এ হাদীস হাসিল করেছি।

বুখারি হাদিস নং ২৫১৩ – সেই ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয় যে মানুষের মধ্যে মিমাংসা করে দেয়।

হাদীস নং ২৫১৩

আবদুল আযীয ইবনে আবদুল্লাহ রহ……….উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, সে ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয়, যে মানুষের মধ্যে মিমাংসা করার জন্য ভাল কথা পৌঁছে দেয় কিংবা ভাল কথা বলে।

বুখারি হাদিস নং ২৫১৪ – “চলো আমরা মিমাংসা করে দেই” সঙ্গীদের প্রতি ইমামের এ উক্তি।

হাদীস নং ২৫১৪

মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ রহ……….সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত যে, কুবা-এর অধিবাসীরা লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে পড়ল। এমনকি তারা পাথর ছোড়াছুড়ি শুরু করল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সে সংবাদ দেওয়া হলে তিনি বললেন, “চলো তাদের মধ্যে মিমাংসা করে দেই”।

বুখারি হাদিস নং ২৫১৫ – মহান আল্লাহর বাণী : তারা উভয়ে আপোস নিষ্পত্তি করতে চাইলে তাদের কোন দোষ নেই এবং আপোস নিষ্পত্তিই শ্রেয় (৪ : ১২৮)

হাদীস নং ২৫১৫

কুতাইবা ইবনে সাঈদ রহ……….আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তা’আলার বাণী : “কোন স্ত্রী যদি তার স্বামীর দুর্ব্যবহার ও উপেক্ষার আশংকা করে” এই আয়াতটি সম্পর্কে তিনি বলেন,

আয়াতের লক্ষ্য হল, সে ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর মধ্যে বার্ধক্য বা অন্য ধরনের অপছন্দনীয় কিছু দেখতে পেয়ে তাকে ত্যাগ করতে মনস্থ করে আর স্ত্রী এ বলে অনুরোধ করে যে, তুমি আমাকে তোমার কাছে রাখ এবং যতটুকু ইচ্ছা আমার প্রাপ্য অংশ নির্ধারণ কর। আয়িশা রা. বলেন, উভয়ে সম্মত হলে এতে দোষ নেই।

 সন্ধি অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৫১৬ – অন্যায়ের উপর লোকেরা সন্ধিবদ্ধ হলে তা প্রত্যাখ্যান যোগ্য।

হাদীস নং ২৫১৬

আদম রহ………..আবদু হুরায়রা রা. ও যায়েদ ইবনে খালিদ জুহানী রা. থেকে বর্ণিত, তাঁরা উভয়ে বলেন যে, এক বেদুঈন এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমাকে কিতাব মুতাবেক আমাদের মাঝে ফায়সালা করে দিন। তখন তার প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়ে বলল, সে ঠিকই বলেছে, হ্যাঁ, আপনি আমাদের মাঝে কিতাবুল্লাহ মুতাবেক ফায়সালা করুন।

পরে বেদুঈন বলল, আমার ছেলে এ লোকরে বাড়ীতে মজুর ছিল। তারপর তার স্ত্রীর সাথে যিনা করে। লোকেরা আমাকে বলল, তোমার ছেলের উপর রজম ওয়াজিব হয়েছে।

তখন আমি আমার ছেলেকে একশত বকরী এবং একটি বাদীর বিনিময়ে এর কাছ থেকে মুক্ত করে এনেছি। পরে আমি আলিমদের কাছে জিজ্ঞাসা করলে তারা বললেন, তোমার ছেলের উপর একশত বেত্রাঘাত এবং এব বছরের নির্বাসন ওয়াজিব হয়েছে।

সব শুনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাদের মাঝে কিতাবুল্লাহ মুতাবেকই ফয়সালা করব। বাদী এবং বকরী পাল তোমাকে ফেরত দেওয়া হবে, আর তোমার ছেলেকে একশত বেত্রাঘাত সহ এক বছরের নির্বাসন দেওয়া হবে।

আর অপরজনকে বললেন, হে উনাইস তুমি আগমীকাল সকালে এ লোকের স্ত্রীর কাছে যাবে (এবং সে স্ত্রী যদি স্বীকার করে) তাকে রজম করবে। উনাইস তার কাছে গেলেন এবং তাকে রজম করলেন।

বুখারি হাদিস নং ২৫১৭

হাদীস নং ২৫১৭

ইয়াকুব ইবনে মুহাম্মদ রহ……….আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : কেউ আমাদের এ শরীয়াতে সংগত নয় এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যান করা হবে।

আবদুল্লাহ ইবনে জাফর মাখরামী রহ. ও আবদুল ওয়াহিদ ইবনে আবু আউন, সাদ ইবনে ইবরাহীম রহ. থেকে তা বর্ণনা করেছেন।

 

বুখারি হাদিস নং ২৫১৮ – কিভাবে সন্ধিপত্র লেখা হবে? অমুকের পুত্র অমুক এবং অমুকের পুত্র অমুক লিখাইতে হবে। গোত্র বা বংশের দিকে সম্বোধন না করলেও ক্ষতি নেই।

হাদীস নং ২৫১৮

মুহাম্মদ ইবনে বাশশার রহ………বারা ইবনে আযিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়াতে সন্ধি করার সময় আলী রা. উভয় পক্ষের মাঝে এক চুক্তিপত্র লিখলেন। তিনি লিখলেন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

মুশরিকরা বলল, ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ লেখা চলবে না। আপনি রাসূল হলে আপনার সঙ্গে লড়াই কিসের? তখন তিনি আলীকে বললেন, ওটা মুছে দাও। আলী রা. বললেন, আমি তা মুছব না।

তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে তা মুছে দিলেন এবং এই শর্তে তাদরে সাথে সন্ধি করলেন যে, তিনি এবং তাঁর সাহাবা তিন দিনের জন্য মক্কায় প্রবেশ করবেন এবং جلبان السلاح ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে প্রবেশ করবেন না। তারা জিজ্ঞাসা করল, جلبان السلاح মানে কি? তিনি বললেন, ‘জুলুব্বান’ অর্থ ভিতরে তরবারীসহ খাপ।

সন্ধি অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৫১৯

হাদীস নং ২৫১৯

উবায়দুল্লাহ ইবনে মূসা রহ………বারা ইবনে আযিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যিলকাদ মাসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরার উদ্দেশ্যে বের হলেন। কিন্তু মক্কাবাসীরা তাকে মক্কা প্রবেশের জন্য ছেড়ে দিতে অস্বীকার করল। অবশেষে এই শর্তে তাদের সাথে ফয়সালা করলেন যে, তিনদিন সেখানে অবস্থান করবেন।

সন্দিপত্র লিখতে গিয়ে মুসলিমরা লিখলেন, এ সন্ধিপত্র সম্পাদন করেছেন, আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম । তারা (মুশরিকরা) বলল, আমরা তাঁর রিসালত স্বীকার করি না। আমরা যদি একথাই মানে করতাম যে, আপনি আল্লাহর রাসূল তাহলে আপনাকে বাধা দিতাম না।

তবে আপনি হলেন, আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ। তিনি বললেন, আমি আল্লাহর রাসূল এবং আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ । তারপর তিনি আলীকে বললেন, রাসূলুল্লাহ শব্দটি মুছে দাও। তিনি বললেন, না। আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে (রাসূলুল্লাহ শব্দটি) কখনো মুছব না।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন চুক্তিপত্রটি নিলেন এবং লিখলেন, এ সন্ধিপত্র মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সম্পন্ন করেন-খাপ বদ্ধ অস্ত্র ছাড়া আর কিছু নিয়ে তিনি মক্কায় প্রবেশ করবেন না। মক্কাবাসীদের কেউ তাঁর সঙ্গে যেতে চাইলে তিনি বের করে দিবেন না। আর তাঁর সঙ্গীদের কেউ মক্কায় থাকতে চাইলে তাকে বাঁধা দিবেন না।

তিনি যখন মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হয়ে গেল, তখন তারা এসে আলীকে বলল, তোমার সঙ্গীকে আমাদের এখান থেকে বের হতে বল। কেননা, নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওয়ানা হলেন। তখন হামজার মেয়ে হে চাচা, হে চাচা, বলেন তাদের পেছনে পেছনে চলল।

আলী রা. তাকে হাত ধরে নিয়ে এলেন এবং ফাতিমাকে বললেন, এই নাও, তোমার চাচার মেয়েকে। আমি ওকে তুলে এনেছি। আলী, যায়েদ ও জাফর তাকে নেওয়ার ব্যাপারে বিতর্কে প্রবৃত্ত হলেন।

আলী রা. বললেন, আমি তার বেশী হকদার। কারণ সে আমার চাচার মেয়ে। জাফর রা. বললেন, সে আমার চাচার মেয়ে এবং তার খালা আমার স্ত্রী। যায়েদ রা. বললেন, সে আমার ভাইয়ের মেয়ে। এরপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালার অনুকূলে ফয়সালা দিলেন এবং বললেন, খালা মায়ের স্থলবর্তী।

আর আলীকে বললেন, আমি তোমার এবং তুমি আমার। জাফরকে বললেন, তুমি আকৃতি ও প্রকৃতিতে আমার সদৃশ্য। আর যায়েদকে বললেন, তুমি তো আমাদের ভাই ও আযাদকৃত গোলাম।

বুখারি হাদিস নং ২৫২০ – মুশরিকদের সাথে সন্ধি।

হাদীস নং ২৫২০

মুহাম্মদ ইবনে রাফি রহ………..ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরা করতে রওয়ানা হলেন। কিন্তু কুরাইশ কাফিরার তাঁর ও বায়তুল্লাহর মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল।

তখন তিনি হুদায়বিয়াতে তাঁর হাদী কুরবানী করলেন, আর মাথা মুড়াইলেন এবং তাদের সাথে সন্ধি করলেন এই শর্তে যে, আগামী বছর তিনি উমরা করবেন আর তরবারি ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র নিয়ে তাদের কাছে আসবেন না ।

আর তারা যতদিন পছন্দ করবে তিনি ততদিন সেখানে থাকবেন। পরের বছর তিনি উমরা করলেন এবং যেমন সন্ধি করেছিলেন তেমনিভাবে মক্কায় প্রবেশ করলেন। তিনি সেখানে তিনদিন অবস্থান করলেন। তারা তাকে বেরিয়ে যেতে বললে, তিনি বেরিয়ে গেলেন।

সন্ধি অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৫২১

হাদীস নং ২৫২১

মুসাদ্দাদ রহ……..সাহল ইবনে আবু হাসমা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খায়বার সন্ধিবদ্ধ থাকাকালে আবদুল্লাহ ইবনে সাহল ও মুহাইয়াসা ইবনে মাসউদ ইবনে যায়েদ রা. খায়বার গিয়েছিলেন।

বুখারি হাদিস নং ২৫২২ – ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে সন্ধি।

হাদীস নং ২৫২২

মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী রহ…………আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রুবাইয়্যি বিনতে নাযর রা. এক কিশোরীর সামনের দাঁত ভেঙ্গে ফেলেছিল। তারা ক্ষতিপূরণ দাবী করল আর অপর পক্ষ ক্ষমা চাইল। তারা অস্বীকার করল এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এল।

তিনি কিসাসের নির্দেশ দিলেন। আনাস ইবনে নাযর রা. তখন বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! রুবাইয়্যি-এর দাঁত ভাঙ্গা হবে? না যিনি আপনাকে সত্য সহ পাঠিয়েছেন তাঁর কসম তার দাঁত ভাঙ্গা হবে না।

তিনি বললেন, হে আনাস ‍! আল্লাহর বিধান হল কিসাস। তারপর বাদীপক্ষ রাযী হয় এবং ক্ষমা করে দেয়। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লারহ বান্দাদের মধ্যে এমন বান্দাও রয়েছেন যে, আল্লাহর নামে কোন কসম করলে তা পূরণ করেন।

ফাযারী রহ. হুমায়দ রহ. সূত্রে আনাস রা. থেকে রিওয়ায়াত করতে গিয়ে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, তখন লোকেরা সম্মত হল এবং ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করল।

বুখারি হাদিস নং ২৫২৩ – হাসান ইবনে আলী রা. সম্পর্কে নবী করীম (সা.) এর উক্তি : আমার এ সন্তানটি নেতৃস্থানীয় সম্ভবত আল্লাহ এর মাধ্যমে দুটি বড় দলের মাঝে সন্ধি স্থাপন করাবেন।

হাদীস নং ২৫২৩

আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ রহ……….হাসান (বসরী) রহ. বলেন, আল্লাহর কসম, হাসান ইবনে আলী রা. পর্বত সদৃশ সেনাদল নিয়ে মুআবিয়া রা.-এর মুখোমুখি হলেন। আমর ইবনে আস রা. বললেন, আমি এমন সেনাদল দেখতে পাচ্ছি যারা প্রতিপক্ষকে হত্যা না করে ফিরে যাবে না।

মুআবিয়া রা. তখন বললেন, আল্লাহর কসম ! আর (মুআবিয়া ও আমর ইবনে আস) রা. উভয়ের মধ্যে মুআবিয়া রা. ছিলেন উত্তম ব্যক্তি। হে আমর ! এরা ওদের এবং ওরা এদের হত্যা করলে, আমি কাকে দিয়ে লোকের সমস্যার সমাধান করব? তাদের নারীদের কে তত্ত্বাবধান করবে?

তাদের দুর্বল ও শিশুদের কে রক্ষণাবেক্ষণ করবে ? তারপর তিনি কুরাইশের বনূ আবদে শামস খার দু’জন আবদুর রহমান ইবনে সামুরাহ ও আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা.-কে হাসান রা.-এর কাছে পাঠালেন। তিনি তাদের বললেন, তোমরা উভয়ে এ লোকটির কাছে যাও এবং তাঁর কাছে (সন্ধির) প্রস্তাব দাও, তাঁর সঙ্গে আলোচনা কর ও তাঁর বক্তব্য জানতে চেষ্টা কর।

তার তাঁর কাছে গেলেন এবং তাঁর সঙ্গে কথা বললেন, আলাপ-আলোচনা করলেন এবং তাঁর বক্তব্য জানলেন। হাসান ইবনে আলী রা. তাদের বললেন, আমরা আবদুল মুত্তালিবের সন্তান, এই সম্পদ আমরা পেয়েছি। আর এর রক্তপাতে লিপ্ত হয়েছে। তার উভয়ে বললেন, (মুআবিআ রা. আপনার কাছে এরূপ বক্তব্য পেশ করেছেন।

আর আপনার বক্তব্যও জানতে চেয়েছেন ও সন্ধি কামনা করেছেন। তিনি বললেন, এ দায়িত্ব কে নিবে? তারা বললেন, আমরা আপনার জন্য এ দায়িত্ব গ্রহণ করছি। এরপর তিনি তাদের কাছে যে সব প্রশ্ন করলেন, তারা বললেন, আমরা এ দায়িত্ব নিচ্ছি। তারপর তিনি তাঁর সাথে সন্ধি করলেন।

হাসান (বসরী) রহ. বলেন, আমি আবু বাকরা রা.-কে বলতে শুনেছি : নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি মিম্বরের উপর দেখেছি, হাসান রা. তাঁর পাশে ছিলেন। তিনি একবার লোকদের দিকে আরেকবার তাঁর দিকে তাকাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, আমার এ সন্তান নেতৃস্থানীয়।

সম্ভবত তার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা মুসলমানের দুটি বড় দলের মধ্যে মিমাংসা করাবেন। আবু আবদুল্লাহ রহ. বলেন, আলী ইবনে আবদুল্লাহ আমাকে বলেছেন যে, এ হাদীসের মাধ্যমেই আবু বাকরা রা. থেকে হাসানের শ্রুতি আমাদের কাছে প্রমাণিত হয়েছে।

সন্ধি অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৫২৪ – আপোস-মিমাংসার ব্যাপারে ইমাম পরামর্শ দিবেন কি?

হাদীস নং ২৫২৪

ইসমাঈল ইবনে আবু উওয়াইস রহ……..আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার দরজায় বিবাদের আওয়াজ শুনতে পেলেন ; দুজন তাদের আওয়াজ উচ্চ করেছিল।

একজন আরেকজনের কাছে ঋণের কিছু মাফ করে দেওয়ার এবং সহানুভূতি দেখানোর অনুরোধ করছিল। আর অপর ব্যক্তির বলছিল, না, আল্লাহর কসম ! আমি তা করব না।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে তাদের কাছে এলেন এবং বললেন, সৎকাজ করবে না বলে যে আল্লাহর নামে কসম করেছে, সে লোকটি তাদের কাছে এলেন এবং বললেন, সৎকাজ করবে না বলে যে আল্লাহর কসম করেছে, সে লোকটি কোথায়? সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমি। সে যা চাইবে তার জন্য তা-ই হবে।

বুখারি হাদিস নং ২৫২৫

হাদীস নং ২৫২৫

ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর রহ………কাব ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ ইবনে আবু হাদরাদ আল-আসলামীর কাছে তার কিছু মাল পাওনা ছিল। রাবী বলেন, একবার সাক্ষাত পেয়ে তিনি তাকে ধরলেন, এমনকি তাদের আওয়াজ চড়ে গেল।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি যেন হাতের ইশারায় বলছিলেন, অর্ধেক (নাও)। তারপর তিনি তার পাওনার অর্ধেক নিলেন আর অর্ধেক ছেড়ে দিলেন।

বুখারি হাদিস নং ২৫২৬

হাদীস নং ২৫২৬

ইসহাক রহ……….আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : মানুষের প্রতিটি হাতের জোড়ার জন্য তার উপর সাদকা রয়েছে। সূর্যোদয় হয় এমন প্রতিদিন মানুষের মধ্যে সুবিচার করাও সাদকা।

বুখারি হাদিস নং ২৫২৮ – পাওনাদারদের মধ্যে এবং মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসদের মধ্যে মিমাংসা করে দেওয়া এবং এ ব্যাপারে অনুমান করা।

হাদীস নং ২৫২৮

মুহাম্মদ ইবনে বাশশার রহ……….জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার পিতার মৃত্যু হল, আর তার কিছু ঋণ ছিল। আমি তাঁর ঋণের বিনিময়ে পাওনাদারদের খেজুর নেওয়ার প্রস্তাব দিলাম। তাঁতে ঋণ পরিশোধ হবে না বলে তারা তা নিতে অস্বীকার করল।

আমি তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে এ বিষয়ে তাঁর নিকট উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, খেজুর পেড়ে মাচায় রেখে রাসূলুল্লাহকে খবর দিও। (যথা সময়ে) তিনি এলেন এবং তাঁর সঙ্গে আবু বকর ও উমর রা.-ও ছিলেন। তিনি খেজুর স্তুপের পার্শ্বে বসলেন এবং বরকতের দুআ করলেন।

পরে বললেন, তোমার পাওনাদারদের ডাক এবং তাদের প্রাপ্য পরিশোধ করে দাও। তারপর আমার পিতার পাওনাদারদের কেউ এমন ছিল না যার ঋণ পরিশোধ করিনি। এরপরও (আমার কাছে) তের ওয়াসক খেজুর রয়ে গেল। সাত ওয়াসক মিশ্র খেজুর আর ছয় ওয়াসক নিম্নমানের খেজুর কিংবা ছয় ওয়াসক মিশ্র ও সাত ওয়াসক নিম্নমানের খেজুর ।

তারপর আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত আদায় করলাম এবং তাকে তা বললাম। তিনি হাসলেন এবং বললেন, আবু বকর ও উমরের কাছে গিয়ে তা বল। তাঁরা বললেন, আমরা আগেই জানতাম যে, যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করার তা করেছেন, তখন অবশ্য এ রূপই হবে।

হিশাম রহ. ওয়াহাব রহ-এর মাধ্যমে জাবির রা. থেকে আসরের সালাতের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি আবু বকর রা. এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাসার কথা উল্লেখ করেননি।

তিনি বর্ণনা করেছেন, (জাবির রা. বলেছেন) আমার পিতা তাঁর জিম্মায় ত্রিশ ওয়াসক ঋণ রেখে মারা গিয়েছেন। ইবনে ইসহাক রহ. ওয়াহাব রহ.-এর মাধ্যমে জাবির রা. থেকে যুহরের সালাতের কথা উল্লেখ করেছেন।

সন্ধি অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৫২৯ – ঋণ ও নগদ মালের বিনিময়ে আপোস করা।

হাদীস নং ২৫২৯

আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ রহ……..কাব ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর যামানায় একবার তিনি ইবনে আবু হাদরাদের কাছে মসজিদের পাওনা ঋণের তাগাদা করলেন।

এতে উভয়ের আওয়াজ চড়ে গেল। এমনকি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘর থেকেই আওয়াজ শুনতে পেলেন।

তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুজরার পর্দা সরিয়ে তাদের কাছে এলেন আর কাব ইবনে মালিক রা.-কে ডাকলেন এবং বললেন, হে কাব ! কাব রা. বললেন, আমি হাযির ইয়া রাসূলাল্লাহ ! রাবী বলেন, তিনি হাতে ইশারা করলেন, অর্ধেক মওকুফ করে দাও।

কাব রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমি তাই করলাম। তারপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ইবনে আবু হাদরাদেকে) বললেন, যাও, তার ঋণ পরিশোধ করে দাও।

আরও পড়ুনঃ

পানি সিঞ্চন অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৪র্থ খণ্ড

ঋণ গ্রহণ অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৪র্থ খণ্ড

কলহ-বিবাদ অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৪র্থ খণ্ড

পড়ে থাকা বস্তু উঠান (কুড়ানো বস্তু) অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) -৪র্থ খণ্ড

জুলুম ও কিসাস অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) -৪র্থ খণ্ড

ইমাম বুখারী

মন্তব্য করুন