সূচনাপত্র: রিসালাত এবং রিসালাতের গুরুত্ব সার্বজনীনতা ও উদ্দেশ্য

সূচনাপত্র: রিসালাত এবং রিসালাতের গুরুত্ব সার্বজনীনতা ও উদ্দেশ্য : মহান আল্লাহ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদার, মহৎ ও সর্বপ্রকারের বৈষম্যমুক্ত একত্ববাদী জীবন ব্যবস্থা ও জীবনের সকল ক্ষেত্রের জন্য পূর্ণাঙ্গ সর্বাত্মক বিধান বা শরীয়া দিয়ে পাঠিয়েছেন। এই শরীয়া সমগ্র মানব জাতির জন্য অতীব সম্ভ্রান্ত ও সুসভ্য জীবনের নিশ্চয়তা দেয় এবং তাদের পূর্ণতা ও উন্নতি-উৎকর্ষের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করায়।

তিনি তেইশ বছর ধরে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছেন। মানুষের নিকট আল্লাহর দীনকে পৌঁছে দেয়া ও তার উপর মানব জাতিকে প্রতিষ্ঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করার যে সংকল্প তিনি নিয়ে এসেছিলেন, তা এই তেইশ বছরে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছেন।

Table of Contents

রিসালাত এবং রিসালাতের গুরুত্ব সার্বজনীনতা ও উদ্দেশ্য :

১. রিসালাতের গুরুত্ব : মুহাম্মদ সা.-এর রিসালতের সার্বজনীনতা :

সূচনাপত্র: রিসালাত এবং রিসালাতের গুরুত্ব সার্বজনীনতা ও উদ্দেশ্য : Fiqh al-Sunnah
Fiqh al-Sunnah

মুহাম্মদ সা.-এর রিসালত কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় যে, পূর্ববর্তী রিসালতগুলোর মতো তা কোনো বিশেষ প্রজন্মের জন্য বা বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট থাকবে এবং অন্যান্য প্রজন্য ও সম্প্রদায় তা থেকে বঞ্চিত থাকবে। বরঞ্চ তার রিসালত সমগ্র মানব জাতির জন্য সর্বব্যাপী ও সার্বজনীন। মহান আল্লাহর রাজত্ব যেমন সমগ্র পৃথিবী ও পৃথিবীতে বিরাজমান সব কিছুর উপর বিস্তৃত। তেমনি তাঁর শেষ রসূলের রিসালতও। তা কোনো বিশেষ শহর বা এলাকার মধ্যেও সীমিত নয়, কোনো বিশেষ যুগ বা কালের মধ্যেও নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

تبرك الذي نزل الفرقان على عبده ليكون للعلمين تليراه:

“কল্যাণময় সেই মহান সত্তা, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি সত্য ও মিথ্যার প্রভেদকারী গ্রন্থ নাযিল করেছেন, যাতে করে সে গোটা বিশ্বের জন্য সতর্ককারী হয়।” (সূরা ২৫, আল-ফুরকান : আয়াত ১)

وما أرسلنك إلا كافة للناس بشيرا ونذيرا ه

তিনি আরো বলেন:
“আমি তোমাকে সমগ্র মানব জাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী করে পাঠিয়েছি।” (সূরা ৩৪, আস-সাবা : আয়াত ২৮)

তিনি আরো বলেন :
قل يايها الناس إلى رسول الله إليكم جميعان الذي له ملك السموت والأرض ، لا إله إلا مو يحي ويميت فامنوا بالله ورسوله النبي الأمي الذي يؤمن بالله وكلمته واتبعوه

لعلكم تهتدون

“(হে মুহাম্মদ!) বলো : হে মানব জাতি, আমি তোমাদের সকলের কাছে আল্লাহর রসূল, যিনি আকাশ ও পৃথিবীর মালিক। তিনি ব্যতিত আর কোনো ইলাহ্ নেই। তিনিই জীবন দেন ও মৃত্যু। দেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর প্রেরিত সেই নিরক্ষর নবীর প্রতি ঈমান আনো, যে স্বয়ং আল্লাহর প্রতি ও তাঁর বাণীসমূহের প্রতি ঈমান রাখে। তোমরা তার অনুসরণ করো। আশা করা যায়, তোমরা হেদায়াত লাভ করবে।” (সূরা ৭, আল-আ’রাফ : আয়াত ১৫৮)

সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : প্রত্যেক নবী নিজ নিজ কওমের নিকট বিশেষভাবে প্রেরিত হতেন। আমি প্রেরিত হয়েছি সাদা কালো নির্বিশেষে সমগ্র মানব জাতির নিকট।”

মুহাম্মদ সা. এর রিসালতের এই ব্যাপকতা ও সার্বজনীনতা নিম্নোক্ত তথ্যাবলী দ্বারা অধিকতর নিশ্চিত হয় :
১. তাঁর আনীত এই দীনে এমন কোনো জিনিস নেই, যা বিশ্বাস করা বা যা অনুসারে কাজ করা মানুষের পক্ষে কঠিন ও দুঃসাধ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন :
“আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার অসাধ্য কোনো কাজের দায়িত্ব দেননা।” (সূরা ২, আল-বাকারা : আয়াত ২৮৬)

তিনি আরো বলেছেন :

يرين الله بكم اليسر ولايريد بكم العسر .

“আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান; যা কষ্টকর তা চাননা।” (বাকারা : আয়াত ১৮৫)
তিনি আরো বলেছেন :
وما جعل عليكم في الدين من حرج

“তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি।” (সূরা ২,আল-হাজ্জ : আয়াত ৭৮)

সহীহ বুখারিতে আবু সাঈদ আল-মাকবারী থেকে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : إن هذا الدين يسرا، ولن يشاد الدين أحن إلا غلبه “এই দীন সহজ, যে ব্যক্তিই দীন পালন করার জন্য কঠোর পন্থা অবলম্বন করবে, সে সফল হবেনা।”

সহীহ মুসলিমের একটি হাদিস নিম্নরূপ

احب الدين إلى الله العنيفية الشمعة .

“উদার তাওহীদবাদী দীনই আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয়।”

২. ইসলামের যে সকল মূলনীতি স্থান ও কালের ব্যবধানে পরিবর্তিত হয়না, যেমন আকায়েদ ও ইবাদত, তা সর্বাত্মক বিস্তারিত বিবরণ সহকারে বিবৃত এবং পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সম্বলিত আয়াত ও হাদিস দ্বারা বিশ্লেষিত হয়েছে। তাই এগুলোতে সামান্যতম কম বা বেশি করার অধিকার কারো নেই। আর যেসব বিষয় স্থান ও কালের ব্যবধানে পরিবর্তত হয়, যেমন নাগরিক জীবনের কল্যাণ সংক্রান্ত বিষয়াদি, রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়াদি তা এসেছে সংক্ষিপ্ত আকারে এর উদ্দেশ্য হলো, এ সকল মূলনীতি যেন সকল যুগে মানুষের কল্যাণ সাধনের সহায়ক হয় এবং শাসক, সমাজপতি ও নেতাগণ সত্য ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠায় তা দ্বারা পথনির্দেশ লাভ করতে পারে।

৩. মুহাম্মদ সা. এর রিসালতে তথা তাঁর আনীত ইসলামী বিধানে যা কিছু দিক নির্দেশনা এসেছে, তা দ্বারা কেবল ইসলামের সুরক্ষা, জীবনের সুরক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তির সুরক্ষা, প্রজাতির সুরক্ষা এবং সম্পদ ও সম্পত্তির সুরক্ষাই কাম্য। আর এটা যে মানুষের জন্মগত স্বভাব প্রকৃতি ও চাহিদার সাথে সংগতিপূর্ণ, তার বুদ্ধি-বিবেকের অনুকূল, তার উন্নতি ও প্রগতির সহায়ক এবং সকল স্থান ও কালের উপযোগী, তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আল্লাহ তায়ালা বলেন :

قل من حرة زينة الله التي أخرج لعباده والطيبت من الرزق ، قل هي للذين امنوا في العيوة الدنيا خالصة يوم القيمة ، كذلك تفصل الأيت لقوم يعلمونه قل إنما حرم ربي الفواحش ما ظهر منها وما بطن والإثم والبغي بغير العق وأن تشركوا بالله مالم ينزل به

سلطنا وأن تقولوا على الله مالا تعلمونه

“বলো, কে নিষিদ্ধ করেছে আল্লাহর সেসব সুন্দর বস্তু ও পবিত্র খাদ্যদ্রব্য, যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য উৎপন্ন করেছেন? তুমি বলো, যারা ঈমান এনেছে, এগুলো দুনিয়ার জীবনে, বিশেষত: কেয়ামতের দিন তাদের (ভোগের জন্য। এভাবে আমি জ্ঞানীদের জন্য আয়াতগুলো বিশদভাবে বর্ণনা করে থাকি। বলো, আমার প্রভু তো কেবল যাবতীয় গোপন ও প্রকাশ্য অশ্লীলতা, পাপাচার, অসংগত অবাধ্যতা, আল্লাহর সাথে কোনো কিছু শরিক করা, যার কোনো প্রমাণ তিনি নাযিল করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা, যা তোমরা জাননা।” (সূরা ৭, আল-আরাফ : আয়াত ৩২-৩৩)

মহামহিম আল্লাহ আরো বলেন :

ورحمتي وسعت كل شيء ، فساكتبها للذين يتقون ويؤتون الزكوة والذين هم بايتنا يؤمنون الذين يتبعون الرسول النبي الأمي الذي يجدونه مكتوبا عند مي في التورية والإنجيل زيامرمر بالمعروف وينهمر عن المنكر ويحل لهم الطيبت وبحرا عليمر الغبنت ويضع عنهم إمرمر والأغلل التي كانت عليمر ، فالذین امنوا به وعزروه ونصروه واتبعوا الثور الذي أنزل معه لا أولئك هم المفلحونه

“আমার রহমত প্রত্যেক বস্তুকে পরিবেষ্টন করে আছে। আমি তা লিখে দেবো তাদের জন্য, যারা সংযম ও সতর্কতা অবলম্বন করে, যাকাত দেয় এবং যারা আমার আয়াতসমূহে ঈমান রাখে, যারা অনুসরণ করে এই রসূলের যে নিরক্ষর নবী, যাকে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিখিত পায়। সে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয়, মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে। সে যাবতীয় পবিত্র বস্তু তাদের জন্য হালাল করে, অপবিত্র বস্তু হারাম করে এবং তাদের উপর যে গুরুভার ও শৃংখল ছিলো, তা তাদের উপর থেকে অপসারিত করে। সুতরাং যারা তার প্রতি ঈমান এনেছে, তাকে সম্মান করেছে, তাকে সাহায্য করেছে এবং তার সাথে অবতীর্ণ আলোর অনুসরণ করেছে, তারাই প্রকৃত সফলকাম।” (আ’রাফ : ১৫৬-১৫৭)

[ রিসালাত এবং রিসালাতের গুরুত্ব সার্বজনীনতা ও উদ্দেশ্য আর্টিকেলটি বড় হওয়ায় প্রথমে একটি টেবিল অব কন্টেন্ট যুক্ত করা হয়েছে ]

২. রিসালাতের গুরুত্ব : মুহাম্মদ সা. এর রিসালতের উদ্দেশ্য:

ইসলামের রিসালতের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে জানা, চেনা ও তাঁর ইবাদতের মাধ্যমে প্রবৃত্তিকে পবিত্র করা, মানবীয় সম্পর্কগুলোকে মজবুত করা এবং স্নেহ, ভালোবাসা, দয়া, সৌভ্রাতৃত্ব, সাম্য ও সুবিচারের ভিত্তির উপর সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করা। এসব কাজ দ্বারাই মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে সুখ ও সৌভাগ্যের অধিকারী হয়।

মহান আল্লাহ বলেছেন :
هو الذي بعث في الامين رسولا منمر يتلوا عليهم ايته ويزكيهم ويعلمهم الكتب والحنية
ق وإن كانوا من قبل لفي ضلل مبينه

“তিনিই নিরক্ষরদের মধ্যে তাদের জন্যে একজন রসূল প্রেরণ করেছেন, যে তাদেরকে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনায় এবং তাদেরকে পবিত্র করে। আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। যদিও তারা ইতিপূর্বে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিপতিত ছিলো।” (সূরা ৬২, আল-জুম’য়া : আয়াত ২)

মহান আল্লাহ আরো বলেছেন : “আমি তোমাকে পুরো জগতবাসীর জন্য করুণারূপেই পাঠিয়েছি।” (সূরা ৬২, আল-আম্বিয়া : আয়াত ১০৭)

রসুল সা. বলেছেন :
“আমি উপহারস্বরূপ প্রদত্ত রহমত।”

[ রিসালাত এবং রিসালাতের গুরুত্ব সার্বজনীনতা ও উদ্দেশ্য আর্টিকেলটি বড় হওয়ায় প্রথমে একটি টেবিল অব কন্টেন্ট যুক্ত করা হয়েছে ]

৩. রিসালাতের গুরুত্ব : ইসলামী আইন প্রণয়ন বা ফিক্‌হ

ইসলামী রিসালতের আওতাভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসলামী আইন প্রণয়ন। এটি ইসলামী রিসালতের তাত্ত্বিক দিক।

নিরেট দীনি আইনের একমাত্র উৎস হলো আল্লাহর অহি, যা কুরআন এবং সুন্নাহয় বিধৃত অথবা রসূল সা. এর সেই ইজতিহাদ অহি দ্বারা বহাল রাখতেন। এই অহি কুরআন ও সুন্নাহর আকারে সুরক্ষিত রয়েছে। নিরেট দীনি আইনের উদাহরণ হলো ইবাদতের বিধান বা আহকাম। এ ক্ষেত্রে রসূলের দায়িত্ব আল্লাহর অহিকে হুবহু ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সহকারে মানুষের নিকট পৌঁছে দেয়ার চেয়ে বেশি নয়। মহান আল্লাহ বলেছেন :

وما ينطق عن المويه إن هو إلا وحي يوحيه

“সে নিজের মনগড়া কথা বলেনা, যা বলে তা প্রেরিত অহি ছাড়া আর কিছু নয়।” (সূরা ৫৩, আন নাজম : আয়াত ৩-৪)

তবে যে সকল ইসলামী আইন পার্থিব বিষয়াদি যথা বিচার, রাজনীতি ও সমরনীতির সাথে সম্পৃক্ত সেগুলোর ব্যাপারে পরামর্শ করতে রসূল সা. কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি কখনো কখনো একটি মত পোষণ করতেন, আবার পরক্ষণেই তা থেকে সরে এসে তাঁর সাহাবিদের মতামত গ্রহণ করতেন। যেমন বদর ও ওহুদের যুদ্ধে সংঘটিত হয়েছে। অথচ সাধারণভাবে সাহাবিগণ রা. সেসব ব্যাপারে তাঁরই শরণাপন্ন হতেন, যা তাঁরা জানতেন না। তা তাঁকে বিজ্ঞাসা করতেন। কুরআন ও হাদিসের যেসব অর্থ তাদের কাছে অজানা থাকতো, তা তাঁর কাছে জানতে চাইতেন, নিজেরা তার যে অর্থ বুঝতেন, তা তাঁর কাছে পেশ করতেন। তিনি কখনো তাদের বুঝকে বহাল রাখতেন। আবার কখনো তাদের বুঝের যেখানে ভুল হয়েছে, তা ধরিয়ে ও শুধরে দিতেন।

ইসলাম কিছু সাধারণ মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে, যার আলোকে মুসলমানরা চলতে পারে। সেগুলো হলো :

১. যে ঘটনা বা সমস্যা এখনো সংঘটিত হয়নি, সংঘটিত না হওয়া পর্যন্ত তার সমাধান অনুসন্ধান থেকে বিরত থাকা

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন :

تسوكر ج وان تسئلوا عنها حين ينزل

يأيها الذين امنوا لاتسئلوا عن أشياء إن تبد لكر القران تبد لكر ، عفا الله عنها ، والله غفور حلیره

“হে মুমিনগণ! সেসব জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করোনা, যা তোমাদের নিকট প্রকাশ করা হলে তোমাদের খারাপ লাগবে। যখন কুরআন নাযিল করা হয়, তখন যদি এরকম জিজ্ঞাসা করো, তাহলে তা তোমাদের নিকট প্রকাশ করা হবে। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, ধৈর্যশীল।” (সূরা ৫, আল-মাইদা : আয়াত ১০১)

হাদিসে আছে : “রসূলুল্লাহ সা. যেসব সমস্যা বাস্তবে এখনো দেখা দেয়নি, তাতে লিপ্ত হতে নিষেধ করেছেন।”

[ রিসালাত এবং রিসালাতের গুরুত্ব সার্বজনীনতা ও উদ্দেশ্য আর্টিকেলটি বড় হওয়ায় প্রথমে একটি টেবিল অব কন্টেন্ট যুক্ত করা হয়েছে ]

২. অধিক মাত্রায় প্রশ্ন করা এবং জটিল বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো থেকে বিরত থাকা :

রসূল সা. বলেছেন : “আল্লাহ তোমাদের জন্য নিষ্প্রয়োজন কথা বলা, মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্ন করা এবং অর্থ সম্পদ অপচয় করা অপছন্দ করেছেন।”

তিনি আরো বলেছেন :

إن الله فرض فرائض فلا تضيعوها وحن حدودا فلا تعتدوها، وحرم أشياء فلا تنتهكوها، وسكت عن أشياء رحمة بكر من غير نسيان فلا تبحثوا عنها، وعنه أيضا أعظم الناس جزما، فيي لم يعرأ نحرا من أجل مسالته. من سأل عنه

আল্লাহ কিছু সংখ্যক কাজকে ফরয করেছেন, সেগুলোকে তোমরা অবহেলা করোনা। কিছু সংখ্যক সীমা নির্ধারণ করেছেন, তা লঙ্ঘন করোনা। কিছু সংখ্যক জিনিসকে হারাম করেছেন, তা অমান্য করোনা। আর কিছু সংখ্যক জিনিস সম্পর্কে নিরবতা অবলম্বন করেছেন তোমাদের প্রতি দয়া পরবশ হয়ে, ভুলে গিয়ে নয়। কাজেই সেগুলোর ব্যাপারে অনুসন্ধানে লিপ্ত হয়োনা।”

রসূলুল্লাহ সা. আরো বলেছেন : সেই ব্যক্তি সবচেয়ে বড় অপরাধী, যে নিষিদ্ধ ছিলনা- এমন জিনিস নিয়ে প্রশ্ন করলো। আর তার প্রশ্ন করার কারণে তা নিষিদ্ধ হলো।”

৩. দীন নিয়ে মতবিরোধ ও দলাদলি থেকে দূরে থাকা

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : “এটি তোমাদেরই উম্মাহ, একটি মাত্র উম্মাহ।” (সূরা ২৩, আল মুমিনুন : আয়াত ৫২)

আল্লাহ আরো বলেছেন: “তোমরা সকলে এক সাথে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং দলে দলে বিভক্ত হয়োনা।” (সূরা-৩, আলে ইমরান, আয়াত : ১০৩)

আল্লাহ আরো বলেন : “পরস্পর বিতর্কে লিপ্ত হয়োনা, তাহলে তোমরা ব্যর্থ হয়ে যাবে এবং তোমাদের উদ্যম ও প্রভাব নষ্ট হবে।” (সূরা ৮, আল আনফাল : আয়াত ৪৬)

আল্লাহ আরো বলেছেন :
إن الذين فرقوا بينهم وكانوا شيعا لست منهر في شيء

“যারা তাদের দীনকে খণ্ড বিখণ্ড করেছে এবং নিজেরা দলে দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই।” (সূরা ৬. আল-আনয়াম: আয়াত ১৫৯)

আল্লাহ আরো বলেন :
ولا تكونوا كالذين تفرقوا واختلقوا من يعل ماجاءهم البينت ، وأولئك لهم عذاب عظيره

“তোমরা তাদের মতো হয়োনা, যারা দলে দলে বিভক্ত হয়েছে এবং সুস্পষ্ট প্রমাণসমূহ তাদের নিকট আসার পরও তারা কলহ-কোন্দলে লিপ্ত হয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ আযাব।” (সূরা ৩, আলে ইমরান : আয়াত ১০৫)

[ রিসালাত এবং রিসালাতের গুরুত্ব সার্বজনীনতা ও উদ্দেশ্য আর্টিকেলটি বড় হওয়ায় প্রথমে একটি টেবিল অব কন্টেন্ট যুক্ত করা হয়েছে ]

৪. বিতর্কিত বিষয়সমূহ রআন ও সুন্নাহর নিকট সোপর্দ করা:

এ কাজ আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীসমূহের আলোকে সম্পন্ন করতে হবে

فان تنازعيتر في شي فردوة إلى الله والرسول –

“যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়, তাহলে সেটিকে আল্লাহ এবং এই রসূলের নিকট সোপর্দ করো।” (সূরা ৪ আন নিসা : আয়াত ৫৯)

“যে জিনিসেই তোমরা মতভেদে লিপ্ত হবে, তার ফায়সালা আল্লাহর প্রতি অর্পিত হবে।” (সূরা ৪২, আশশূরা : আয়াত ১০)

এর কারণ হলো, আল্লাহর কিতাব দীনের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন :

ونزلنا عليك الكتب تبيانا لكل شيء

“আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি সকল বিষয়ের বিবরণ সম্বলিত।” (সূরা ১৬. আন আল্লাহ আরো বলেছেন : নাহল : আয়াত ৮৯)

ما فرطنا في الكتب من شيء

“আমি কোনো বিষয়ই আল কিতাবে লিখতে বাদ রাখিনি। (সূরা-৬, আল আনয়াম : আয়াত ৩৮) শুধু কুরআন নয়, রসূলের বাস্তব সুন্নাহর মাধ্যমেও তা বর্ণনা করা হয়েছে।
আল্লাহ বলেছেন :

وانزلنا إليك الذكر لتبين للناس مانزل اليمر .

“আমি তোমার প্রতি স্মারক অবতীর্ণ করেছি, যাতে করে তুমি মানুষকে তাদের নিকট যা অবতীর্ণ হয়েছে তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দাও।” (সূরা ১৬, আন নাহল : আয়াত ৪৪) আল্লাহ আরো বলেছেন : “আমি তোমার প্রতি সত্য সহকারে কিতাব নাযিল করেছি। যাতে করে আল্লাহ তোমাকে যা জানিয়েছেন, তদনুসারে মানুষের মাঝে ফায়সালা করো।” (সূরা ৪, আন নিসা : আয়াত ১০৫) বস্তুত কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে সকল বিবাদের মীমাংসা করার জন্যই আদেশ দেয়া হয়েছে এবং যাবতীয় পথনির্দেশনা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন :

اليوم أكملت لگر دینگر واتممت علیکم نعمتی ورضيت لكم الإسلام دينا .

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামতকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা ৫, আল মাইদা : আয়াত ৩)

যতোদিন পর্যন্ত দীনের বিধিবিধান এই নিয়মে বিশ্লেষিত হতে থাকবে এবং বিতর্কের নিষ্পত্তির জন্য এর মূল উৎসের নিকট প্রত্যাবর্তন যে অপরিহার্য, তা যতোদিন সকলের নিকট সুবিদিত থাকবে, ততোদিন এই দীনে মতভেদের কোনো সুযোগও নেই, অর্থও নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন :

وان الذين اختلفوا في الكتب لفي شقاق بعيل

“যারা কিতাবে মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। তারা সুদূর প্রসারী দ্বন্দ্ব-কলহে নিপতিত।” (সূরা ২, আল বাকারা : আয়াত ১৭৬)

আল্লাহ আরো বলেন :

وربك لايؤمنون حتى يحكموك فيما شجر بينهم ثر لايجدوا في انفسمر مرجا ما

تضيت ويسلموا تسليمان

“তোমার প্রভুর শপথ, তারা যতোদিন পর্যন্ত তাদের বিবাদ বিসম্বাদে তোমাকে চূড়ান্ত ফায়সালাকারী না মানবে, অতপর তুমি যে নিষ্পত্তি করে দিয়েছ তা মেনে নিতে অন্তরে কিছুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবেনা এবং পরিপূর্ণরূপে প্রশান্ত চিত্তে তা মেনে নেবে, ততোদিন পর্যন্ত তারা মুমিন হতে পারবেনা।” (সূরা ৪, আননিসা : আয়াত ৬৫)

[ রিসালাত এবং রিসালাতের গুরুত্ব সার্বজনীনতা ও উদ্দেশ্য আর্টিকেলটি বড় হওয়ায় প্রথমে একটি টেবিল অব কন্টেন্ট যুক্ত করা হয়েছে ]

এই নীতিমালার আলোকেই সাহাবিগণ ও তাদের পরবর্তী কল্যাণময় শতাব্দীসমূহের মুসলমানগণ জীবন অতিবাহিত করেছেন। মুষ্টিমেয় কতোক মাসআলা ব্যতিত কোনো

ব্যাপারেই তাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়নি। যে কয়টি বিষয়ে মতভেদ হয়েছে, তার কারণ ছিলো, কুরআন ও সুন্নাহর সংশ্লিষ্ট ভাষ্যসমূহের তাৎপর্য অনুধাবনে তাদের মধ্যে পার্থক্য দেখা দিয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট ভাষ্যসমূহের কোনো কোনোটি তাদের কারো কারো জানা ছিলো, কারো বা জানা ছিলনা।

তারপর যখন চার মাযহাবের ইমামদের আবির্ভাব ঘটে, তাঁরা তাঁদের পূর্ববর্তীদের রীতি অনুসরণ করেন। তবে তাঁদের মধ্যে একটি গোষ্ঠী রসূলের সুন্নাহর অধিকতর নিকটবর্তী ছিলেন। যেমন হিজাযবাসীগণ, যাদের মধ্যে রসূলের সুন্নাহ ও সাহাবিদের আছার (উক্তি) বহনকারীদের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত বেশি ছিলো। অপর গোষ্ঠী নিজেদের বিচারবুদ্ধির অধিকতর কাজে লাগিয়েছেন, যেমন ইরাকবাসীদের মধ্যে হাদিসের হাফেযের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম ছিলো। অহি নাযিলের স্থান থেকে তাঁদের আবাসভূমির দূরত্বই ছিলো এর কারণ।

এই ইমামগণ জনগণকে ইসলামের জ্ঞানে সমৃদ্ধ করতে ও ইসলামের পথে পরিচালিত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। তাঁরা জনগণকে তাদের অন্ধ অনুকরণ করতে নিষেধ করতেন এবং বলতেন আমাদের মতের সপক্ষে আমরা যে প্রমাণ দর্শাই তা না জেনে আমাদের মত গ্রহণ করা ও তদনুসারে বক্তব্য প্রদান করা কারো জন্য বৈধ নয়। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, সহীহ হাদিসই তাঁদের মাযহাব। পাপমুক্ত ও ভুলত্রুটিমুক্ত রসূলের ন্যায় তাদেরকেও চোখ বুঝে অনুসরণ করা হোক- এটা তারা চাইতেননা। মানুষকে আল্লাহর হুকুম বুঝতে সাহায্য করাই ছিলো তাদের একমাত্র লক্ষ্য।

কিন্তু পরবর্তীকালে মানুষের মনোবল নিস্তেজ ও সংকল্প দুর্বল হয়ে পড়ায় তাদের মধ্যে অন্ধ অনুকরণের প্রবণতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এর ফলে তাদের প্রতিটি গোষ্ঠী একটা নির্দিষ্ট মাযহাব নিয়ে সন্তুষ্ট হয়। সেই মাযহাবের মধ্যেই তাদের চিন্তা গবেষণা ও ধ্যান জ্ঞান সীমিত হয়ে পড়ে। তার উপরই তারা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তার গোঁড়া সমর্থকে পরিণত হয়। তার সমর্থন ও সহায়তায় সর্বশক্তি তারা নিয়োগ করে। নিজেদের ইমামের উক্তিকে আল্লাহ ও রসূলের উক্তির সমান মর্যাদা দেয়। তাদের ইমামের মতের বিপরীতে কোনো ফতোয়া দেয়াও এই গোষ্ঠীর কোনো আলেম বৈধ মনে করেনা। নিজ নিজ মাযহাবের ইমামের প্রতি অন্ধ ভক্তির মাত্রা এতোদূর বেড়ে যায় যে, কারখী বলেন : “আমাদের ইমামদের মতের বিরুদ্ধে যায় এমন আয়াত বা হাদিস মাত্রই হয় ব্যাখ্যা সাপেক্ষ নচেত রহিত।”

মাযহাবের অন্ধ অনুকরণ ও গোঁড়া পক্ষপাতিত্বের দরুন মুসলমানদের কিছু কিছু গোষ্ঠী কুরআন ও সুন্নাহর হেদায়াত থেকে বঞ্চিত হতে আরম্ভ করে। ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে- এই মর্মে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। ফকীহরা যা বলেন, তাই হয়ে দাঁড়ায় শরিয়ত । ফকীহদের বক্তব্য ও মতামতের মধ্যেই শরীয়া সীমাবদ্ধ ড়ে। ফকীহদের মত থেকে যে-ই ভিন্ন মত অবলম্বন করে তাকে বিদ’আতী আখ্যায়িত করা হয়। তার মত অগ্রহণযোগ্য ও তার ফতোয়া অনির্ভরযোগ্য গণ্য করা হয়।

এই সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামির ব্যাপকতর প্রসারে যে জিনিসটি সহায়কের ভূমিকা পালন করে তা ছিলো শাসক ও ধনিক গোষ্ঠী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাসমূহ এবং সেই সব মাদ্রাসার পাঠ্য বিষয়কে নির্দিষ্ট একটি মাযহাব বা মাযহাবের শিক্ষা দানে সীমিত রাখা। একাজ ঐসব মাযহাবের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া ও ইজতিহাদ থেকে দূরে সরে যাওয়ার মোক্ষম কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যাতে করে তাদের জন্য যে জীবিকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল তা বহাল থাকে। কথিত আছে, আবু যারয়া তার উস্তাদ বালকিনীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন :

আচ্ছা বলুন তো, শেখ তাকিউদ্দীন সাবকীর ইজতিহাদ থেকে বিরত থাকার হেতু কী?

ইজতিহাদের যাবতীয় যোগ্যতা ও উপকরণ তো তাঁর করায়ত্ব। বালকিনী চুপ করে রইলেন। কিছুক্ষণ পর আবু যারয়া বললেন :

“আমার তো মনে হয়, এ থকে বিরত থাকার একমাত্র কারণ হলো সেই সকল চাকুরি, যা চার মাযহাবের ফকীহদের জন্য বরাদ্দ হয়ে আছে। যারা এই চার মাযহাবের বাইরে যাবে, তারা কোনো চাকুরিই পাবেনা। তাদের কেউ যেমন কাযী হতে পারবেনা, তেমনি জনগণও তাদের ফতোয়া গ্রহণ করবেনা, বরং তাদেরকে বিদ’আতী বলে আখ্যায়িত করা হবে।” একথা শুনে বালকিনী মুচকি হাসলেন এবং তাকে সমর্থন করলেন।

এহেন তাকলীদ তথা অন্ধ অনুকরণের জটাজালে আবদ্ধ হয়ে কুরআন ও সুন্নাহর হেদায়াত থেকে বঞ্চিত হয়ে এবং ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা মেনে নিয়ে মুসলিম উম্মাহ ঘোরতর বিপাক ও বিপর্যয়ে পতিত হয়েছে এবং সেই গুঁইসাপের গর্তে ঢুকেছে, যা থেকে রসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে সতর্ক করেছিলেন।

এর ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, মুসলিম উম্মাহ নানা দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এমনকি হানাফী মাযহাবের মেয়ের সাথে শাফেয়ী ছেলের বিয়ে জায়েয হবে কিনা তা নিয়ে পর্যন্ত কেউ কেউ মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। কেউ কেউ বলেন : এ ধরনের বিয়ে জায়েয হবেনা। কারণ হানাফীরা শাফেয়ীদের ঈমান নিয়েই সন্দেহ পোষণ করে। অন্যেরা বলেন: বৈধ। কারণ কোনো ইহুদী খৃস্টান নারীর সাথে যখন বিয়ে বৈধ, তখন এদের সাথেও বৈধ হবে। এর ফলে বিদ’আতেরও ব্যাপক প্রসার ঘটেছে, ইসলামের চিরন্তন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

[ রিসালাত এবং রিসালাতের গুরুত্ব সার্বজনীনতা ও উদ্দেশ্য আর্টিকেলটি বড় হওয়ায় প্রথমে একটি টেবিল অব কন্টেন্ট যুক্ত করা হয়েছে ]

বুদ্ধিবৃত্তিক চেষ্টা সাধনা স্তব্ধ হয়ে যেতে বসেছে, চিন্তা গবেষণামূলক তৎপরতা স্থবির হয়ে যাচ্ছে এবং জ্ঞানগত স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর এসব উপসর্গ মিলিত হয়ে মুসলিম জাতির স্বকীয়তাকে দুর্বল ও নিস্তেজ করে দিয়েছে, তাকে তার উৎপাদনশীল জীবন থেকে বঞ্চিত করেছে। তার উন্নতি ও অগ্রগতি থামিয়ে দিয়েছে। আর এই সুযোগে তার অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশকারী শত্রুরা ফাঁক ফোকর দিয়ে ইসলামের মূল অস্তিত্বে ঢুকে পড়েছে ।

এভাবে বহু বছর কেটে গেছে। বহু শতাব্দী পার হয়ে গেছে। আল্লাহর চিরন্তন রীতি হলো, তিনি কিছুকাল পরপরই এই উম্মতের মধ্যে এমন ব্যক্তিগণকে পাঠান, যারা তাদের দীনকে নতুন করে উপস্থাপন করেন, উম্মাহকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন। তাকে সত্য ও ন্যায়ের পথের দিশা দেখান। তবে এ উম্মাহ তার পূর্ববর্তী শোচনীয় অবস্থা বা তার চেয়েও কঠিন অবস্থায় ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত ঘুম থেকে যেনো জাগতেই চাইছেনা।

অবশেষে এসেছে ইসলামী আইন প্রণয়নের পালা, যা দ্বারা আল্লাহ সমগ্র মানব জাতির জীবনকে সুশৃংখল ও সংগঠিত করেছেন। একে তাদের ইহকাল ও পরকালের অবলম্বন বানিয়েছেন। অথচ এই আইন প্রণয়নের কাজকে এতো নিম্নস্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে, যার কোনো নজির ইতিহাসে পাওয়া যায়না। একে এক গভীর খাদে নিক্ষেপ করা হয়েছে। একে নিয়ে চিন্তা গবেষণা ও চেষ্টা সাধনা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা মনমগজবিনাশী ও সময় অপচয়কারী কাজ, যা আল্লাহর দীনেরও কোনো কল্যাণ সাধন করেনা, মানুষের পার্থিব জীবনকে সুশৃংখল করতেও কোনো অবদান রাখেনা।

এখানে উদাহরণস্বরূপ শেষ যুগের জনৈক ফকীহর লিখিত ফিকহ গ্রন্থের একটি উদ্ধৃতি পেশ করছি : “ইবনে আরাফা ‘ইজারা’ (ভাড়া দেয়া) এর সংজ্ঞা দিয়েছেন : নৌকা ও প্রাণী ব্যতীত স্থাবর সম্পত্তির উপকারিতা বিক্রয় করা, যার মধ্য থেকে উৎপন্ন কোনো বিনিময় দ্বারা তাকে উপলব্ধি করা যায় না, যাকে খণ্ড বিখণ্ড করলে তার অংশ বের হয়।” এ সংজ্ঞা শুনে তাঁর, জনৈক ছাত্র আপত্তি জানালো যে, এর ‘অংশ’ শব্দটি সংজ্ঞাকে সংক্ষেপিত করার পরিপন্থী। এটি উল্লেখ করার কোনো প্রয়োজন নেই। উক্ত ফকীহ দুইদিন কোনো জবাব দেয়া থেকে বিরত থাকলেন। তারপর এমন জবাব দিলেন যা একেবারেই নিরর্থক।”

বস্তুত: ইসলামী আইন প্রণয়নের কাজ এতোটাই নিম্নস্তরে উপনীত হয়েছিল। আলেমগণ কিতাবের মূল ভাষা ব্যতীত অন্য কিছুকে গুরুত্ব দিতেননা। বড়জোর তার টিকা, টিকাতে যে সকল তথ্য আপত্তি ও হেঁয়ালি থাকে এবং তা নিয়ে যেসব আলোচনা লেখা হয়, সেগুলো তারা পড়তো। এহেন পরিস্থিতিতেই শেষ পর্যন্ত একদিন ইউরোপ প্রাচ্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। তার আগ্রাসী থাবা দিয়ে সব কিছু তছনছ ও পা দিয়ে মাড়িয়ে সব কিছু ধুলিস্মাত করে দিলো।

আগ্রাসনের আঘাতে আঘাতে একদিন যখন প্রাচ্যবাসীর ঘুম ভাঙলো এবং ডানে বামে তাকালো, তখন দেখলো, দ্রুত ধাবমান বিশ্ববাসীর জীবন থেকে তারা অনেক পিছিয়ে আছে। সভ্যতার চলমান কাফেলা সামনে এগিয়ে চলেছে। আর তারা বসে আছে নির্বিকারভাবে। দেখলো, তারা এক নতুন বিশ্বের মুখোমুখি, যে বিশ্ব জীবনের জয়গানে মুখর, যে বিশ্ব শক্তি ও উৎপাদনশীলতায় অপ্রতিহত গতিতে আগুয়ান। সে দৃশ্য দেখে তারা হতবিহ্বল হয়ে পড়লো। তন্মধ্য থেকে একটি গোষ্ঠী যারা নিজেদের ইতিহাস ভুলে গেছে। নিজেদের পূর্ব পুরুষদের অবাধ্য সন্তানে পরিণত হয়েছে এবং নিজের দীন ও ঐতিহ্য বিস্তৃত হয়ে গেছে, তারা চিৎকার করে বলতে লাগলো : ওহে প্রাচ্যবাসী। এই দেখ ইউরোপ কত উন্নতি সাধন করেছে।

[ রিসালাত এবং রিসালাতের গুরুত্ব সার্বজনীনতা ও উদ্দেশ্য আর্টিকেলটি বড় হওয়ায় প্রথমে একটি টেবিল অব কন্টেন্ট যুক্ত করা হয়েছে ]

এসো, তার পদাংক অনুসরণ করো। তারা ইউরোপকে নির্দ্বিধায় ও চোখ বুজে অনুকরণ করা শুরু করলো, চাই তা ঈমানের সাথে সংগতিপূর্ণ হোক কিংবা কুফরী হোক। ভালো হোক কি মন্দ হোক। আর যারা আকণ্ঠ জড়তা ও গোঁড়ামীতে নিমজ্জিত ছিলো তারা গ্রহণ করলো নেতিবাচক অবস্থান। ঘন ঘন “লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” ও “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” পড়া, নিজেদের জীবন ধারাকে সামাল দিয়ে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়া এবং ঘরের কোনে গিয়ে বসা- এই হয়ে দাঁড়ালো তাদের কর্মপন্থা।

আর এ কর্মপন্থা ইসলামের অহংকারী শত্রুদের নিকট আরো একটা প্রমাণ তুলে ধরলো ইসলামী শরিয়ত উন্নতি ও প্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনা এবং যুগোপযোগী নয়। তারপর যে পরিণাম অনিবার্য ছিলো, তাই হলো। আগ্রাসী বিদেশী আইনই প্রাচ্যবাসীর জীবনে কর্তৃত্বশীল ও নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়ালো। অথচ তা ছিলো প্রাচ্যবাসীর ধর্ম, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এমনকি ইউরোপীয় রীতিনীতি ও জীবনাচার পরিবারে, রাস্তাঘাটে, সভা সমিতিতে, স্কুল কলেজে ও শিক্ষা সংস্কৃতির কেন্দ্রগুলোতে পর্যন্ত আগ্রাসন চালাতে লাগলো।

শুধু তাই নয়, ইউরোপের সাংস্কৃতিক জোয়ার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জোরদার ও পরাক্রান্ত হয়ে উঠতে লাগলো। আর এর পরিণামে প্রাচ্য তার ধর্ম ও ঐতিহ্যকে ভুলে যাওয়ার উপক্রম করলো। তার অতীত ও বর্তমানের মধ্যে যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে যেতে বসলো। তবে আল্লাহর একটা চিরন্তন নিয়ম হলো, পৃথিবী তাঁর দীন প্রতিষ্ঠাকারী লোক থেকে শূন্য থাকেনা। তাই সংস্কারের আহ্বায়করা তৎপর হয়ে উঠলো। তারা পাশ্চাত্য কর্তৃক প্রতারিতদের হুঁশিয়ার করতে লাগলো : সাবধান হয়ে যাও! পাশ্চাত্য সভ্যতার পক্ষে প্রচারণা থেকে নিবৃত্ত হও।

কারণ পাশ্চাত্যবাসীর নৈতিক অধোপতন তাদেরকে চরম শোচনীয় পরিণতির সম্মুখীন না করে ছাড়বেনা। বিশুদ্ধ ঈমান দ্বারা তারা যদি তাদের স্বভাবকে সংশোধন না করে এবং নৈতিক চরিত্রের উচ্চতম ও উৎকৃষ্টতম আদর্শের অনুকরণে তারা যদি তাদের চরিত্রকে না বদলায়, তাহলে অচিরেই তাদের বিজ্ঞান সর্বনাশা হাতিয়ারে পরিণত হবে, যা তাদের মনোরম নগরীগুলো এমন অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করবে, যা তাদেরকে গ্রাস করবে এবং

জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে। যেমন আল্লাহ বলেছেন : “তুমি কি দেখনি, তোমার প্রতিপালক তাদের সাথে কেমন আচরণ করেছেন? তারা ছিলো ইরাম গোত্রভুক্ত, সুউচ্চ স্তম্ভের মতো দেহধারী, যাদের মতো আর কোনো মানুষ দেশগুলোতে সৃষ্ট করা হয়নি। আর ছামুদের সাথেই বা কেমন ব্যবহার করা হয়েছিল, যারা পাহাড়ের উপত্যকায় পাথর কেটে গৃহনির্মাণ করেছিল, আর ফেরাউনের সাথেই বা কেমন আচরণ করা হয়েছিল, যে ছিলো বহু শিবিরের অধিপতি, যারা দেশে সীমা লংঘন করেছিল এবং সেখানে বহু বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। তাই তোমার প্রভু তাদের উপর শাস্তির কষাঘাত হানলেন । তোমার প্রভু ওঁৎ পেতে আছেন।” (সূরা ৮৯. আল ফজর : আয়াত ৬-১৪)

[ রিসালাত এবং রিসালাতের গুরুত্ব সার্বজনীনতা ও উদ্দেশ্য আর্টিকেলটি বড় হওয়ায় প্রথমে একটি টেবিল অব কন্টেন্ট যুক্ত করা হয়েছে ]

সংস্কারের আহ্বায়করা ঘরকুনো নিশ্চল লোকদের চিৎকার করে বলতে লাগলো : তোমরা নির্ভুল জ্ঞানের উৎস কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরো, এই উৎস দু’টি থেকে তোমাদের দীনকে খুঁজে নাও, আর এ দ্বারা অন্যদেরকেও সুসংবাদ দাও। তাহলে এই উদভ্রান্ত বিশ্ব তোমাদের সাহায্যে সরল সঠিক পথের সন্ধান পাবে, শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভ করবে এই নির্যাতিত পৃথিবী।

আল্লাহ বলেন :

لقن كان لكم في رسول الله أسوة حسنة لمن كان يرجوا الله واليوم الأخر وذكر الله كثيراه

“আল্লাহর রসূলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য সুন্দরতম আদর্শ- তাদের জন্য, যারা আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহকে বেশি করে স্মরণ করে।” (আল-আহযাব : আয়াত ২১)।

আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী, কিছু সংখ্যক পুণ্যবান ও মহৎ লোক এই ডাকে সাড়া দিয়েছে। তারা একাগ্র চিত্তে এ দাওয়াতকে গ্রহণ করেছে। এ দাওয়াতকে মেনে নিয়েছে এমন একদল যুবক ও তরুণ, যারা তাদের সর্বাধিক মূল্যবান সম্পদ ও জীবন এই দাওয়াতের কাজে নিয়োগ করেছে।

এই মহতী উদ্যোগ জনমনে কৌতূহল ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আশা ও উদ্দীপনার আতিশয্যে তাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে : এবার কি তাহলে আল্লাহ পৃথিবীকে তাঁর আলোতে নতুন করে প্রজ্জ্বলিত হবার অনুমতি দিলেন? তিনি কি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে, এখন মানুষ ঈমান ইহসান, সুবিচার ও সৌভ্রাতৃত্বে উদ্দীপিত পবিত্র ও নির্মল জীবন যাপন করুক? নিম্নের আয়াত দু’টি এই বিষয়েই তো সাক্ষ্য দিচ্ছে :

مر الذي أرسل رسوله بالهدى ودين الحق ليظهره على الدين كله ، وكفى بالله شمينان

“তিনিই সেই সত্তা, যিনি তাঁর রসূলকে হেদায়েত ও সত্য দীন সহকারে পাঠিয়েছেন, যাতে তাকে অন্য সকল মত ও পথের উপর বিজয়ী করে দেন, আর আল্লাহই সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট।” (সূরা ৪৮, আল ফাত্‌হ, : (আয়াত ২৮)

يتبين لمر انه الحق ، أولم يكف بربك انه

ستريمر ايتنا في الأفاق وفي انقسمر حتى على كل شيء شميده

“আমি অচিরেই তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখিয়ে দেব দিগন্ত জুড়ে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে, যাতে করে তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় এ কুরআন সত্য। তোমার রব সর্ববিষয়ে সাক্ষী- এটা কি যথেষ্ট নয়?” (সূরা ৪১, হামীম সাজদাহ : আয়াত ৫৯)

আরও পড়ুন:

 

মন্তব্য করুন