যুদ্ধাভিযান পার্ট ১০ (অবশিষ্ট অংশ) । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৭ম খণ্ড

যুদ্ধাভিযান পার্ট ১০ (অবশিষ্ট অংশ)

যুদ্ধাভিযান পার্ট ১০ (অবশিষ্ট অংশ) । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৭ম খণ্ড

Table of Contents

যুদ্ধাভিযান পার্ট ১০ (অবশিষ্ট অংশ) । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৭ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৪০৫৬

হাদীস নং ৪০৫৬

ইবরাহীম ইবনে মুনযির রহ………….ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাফলা রা. ইবনে উমর রা.-কে জানিয়েছেন যে, বিদায় হজ্জের বছর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের হালাল হয়ে যেতে নির্দেশ দেন।

তখন হাফসা রা. জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি কারণে হালাল হচ্ছেন না? তদুত্তরে তিনি বললেন, আমি আঠা (গাম) জাতীয় বস্তু দ্বারা আমার মাথার চুল জমাট করে ফেলেছি এবং কুরবানীর পশুর (নিদর্শনস্বরূপ) গলায় চর্ম বেঁধে দিয়েছি।

কাজেই, আমি তদুত্তরে তিনি বললেন, আমি আঠা (গাম) জাতীয় বস্তু দ্বারা আমার মাথার চুল জমাট করে ফেলেছি এবং কুরবানীর পশুর (নিদর্শনস্বরূপ) গলায় চর্ম বেঁধে (গলতানী বা গলকণ্ঠ) দিয়েছি।

কাজেই, আমি আমার (হজ্জ সমাধা করার পর) কুরবানীর পশু যবেহ করার পূর্বে হালাল হতে পারব না।

বুখারি হাদিস নং ৪০৫৭

হাদীস নং ৪০৫৭

আবুল ইয়ামান রহ………..ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত যে, আশআম গোত্রের এ মহিলা বিদায় হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জিজ্ঞাসা করে।

এ সময় ফযল ইবনে আব্বাস রা. )একই যানবাহনে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে উপবিষ্ট ছিলেন। মহিলাটি আবেদন করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি হজ্জ ফরয করেছেন।

আমার পিতার উপর তা এমন অবস্থায় ফরয হল যে তিনি অতীব বয়োবৃদ্ধ, যে কারণে যানবাহনের উপর সোজা হয়ে বসতেও সমর্থ নন। এমতাবস্থায় আমি তাঁর পক্ষ থেকে (নায়েবী) হজ্জ আদায় করলে তা আদায় হবে কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ।

বুখারি হাদিস নং ৪০৫৮

হাদীস নং ৪০৫৮

মুহাম্মদ রহ…………ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ফাতহে মক্কার বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগিয়ে চললেন। তিনি (তাঁর) কসওয়া নামক উটনীর উপর উসামা রা.-কে পিছনে বসালেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিলাল ও উসমান ইবনে তালহা রা।

অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তাঁর বাহনকে) বায়তুল্লাহর নিকট বসালেন। তারপর উসমান (ইবনে তালহা) রা কে বললেন, আমার কাছে চাবি নিয়ে এসো। তিনি তাকে চাবি এনে দিলেন। এরপর কাবা শরীফের দরজা তাঁর জন্য খোলা হল।

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, উসামা, বিলাল এবং উসমান রা. কাবা ঘরে প্রবেশ করলেন। তারপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল।

এরপর তিনি দিবা ভাগের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন এবং পরে বের হয়ে আসেন। তখন লোকেরা কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করার জন্য তাড়াহুড়া করতে থাকে। আর আমি তাদের অগ্রগামী হই এবং বিলাল রা.-কে কাবার দরজার পিছনে দাঁড়ানোবস্থায় পাই।

তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন স্থানে নামায আদায় করেছেন? তিনি বললেন, ঐ সামনের দু’স্তম্ভের মাঝখানে।

এ সময় বায়তুল্লাহর দুই সারিতে ছয়টি স্তম্ভ চিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনের দুই খামের মাঝখানে নামায আদায় করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহর দরজা তার পিছনে রেখেছিলেন এবং তাঁর চেহারা ছিল আপনার বায়তুল্লাহয় প্রবেশকালে সামনে য দেয়ালে পড়ে সেদিকে।

ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত রাকাত নামায আদায় করেছেন তা জিজ্ঞাসা করতে আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আর যে স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায আদায় করেছিলেন সেখানে লাল বর্ণের মর্মর পাথর ছিল।

বুখারি হাদিস নং ৪০৫৯

হাদীস নং ৪০৫৯

আবুল ইয়ামান রহ…………নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণী আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণী হুয়াই-এর কন্যা সাফিয়া রা. বিদায় হজ্জের সময় ঋতুবতী হয়ে পড়েন।

তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে কি আমাদের (মদীনার পথে প্রত্যাবর্তনে) বাঁধ সাধল? তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! তিনি তো তাওয়াফে যিয়ারাহ আদায় করে নিয়েছেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে সেও রওয়ানা করুক।

যুদ্ধাভিযান পার্ট ১০ (অবশিষ্ট অংশ) । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৭ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৪০৬০

হাদীস নং ৪০৬০

ইয়াইয়া ইবনে সুলাইমান রহ………..ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে উপস্থিত থাকাবস্থায় আমরা বিদায় হজ্জ সম্পর্কে আলোচনা করতাম।

আর আমরা বিদায় হজ্জ কাকে বলে তা জানতাম না। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা বর্ণনা করেন। তারপর তিনি মাসীহ দাজ্জাল সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা করেন এবং বলেন, আল্লাহ এমন কোন নবী প্রেরণ করেননি যিনি তাঁর উম্মতকে সতর্ক করেননি।

নূহ আ. এবং তাঁর পরবর্তী নবীগণও তাদের উম্মতগণকে এ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। সে তোমাদের মধ্যে প্রকাশিত হবে। তার অবস্থা তোমাদের উপর প্রচ্ছন্ন থাকবে না।

তোমাদের কাছে এও অস্পষ্ট নয় যে, তোমাদের রব (আল্লাহ) এক চোখ কানা নন। অথচ দাজ্জালের ডান চোখ কানা হবে। যেন তার চোখ একটি ফোলা আঙ্গুর।

তোমরা সতর্ক থাক। আজকের তোমার উপর হারাম করেছেন। তোমরা লক্ষ্য কর, আমি কি আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি। সমবেত সকলে বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, হে আল্লাহ ! আপনি সাক্ষী থাকুন।

তিনি এ কথা তিনবার বললেন, (তারপর বললেন) তোমাদের জন্য পরিতাপ অথবা তিনি বললেন, তোমাদের জন্য আফসোস, সতর্ক থেকো, আমার পরে তোমরা কুফরের দিকে প্রত্যাবর্তন করো না যে, একে অপরের গর্দান মারবে।

বুখারি হাদিস নং ৪০৬১

হাদীস নং ৪০৬১

আমর ইবনে খালিদ রহ……..যায়েদ ইবনে আরকাম রা. থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনিশটি যুদ্ধে স্বয়ং অংশগ্রহণ করেন। আর হিজরতের পর তিনি কেবল একটি হজ্জ আদায় করেন।

এরপর তিনি আর কোন হজ্জ আদায় করেননি এবং তা হল বিদায় হজ্জ। আবু ইসহাক রহ. বলেন, মক্কায় অবস্থানকালে তিনি (নফল) হজ্জ আদায় করেন।

বুখারি হাদিস নং ৪০৬২

হাদীস নং ৪০৬২

হাফস ইবনে উমর রহ…………জাবির রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জারীর রা-কে বিদায়-হজ্জে বললেন, লোকজনকে চুপ থাকতে বল। তারপর বললেন, মনে রেখ ! আমার ইন্তিকালের পর তোমরা কাফিরে পরিণত হয়ো না যে, একে অপরের গর্দান মারবে।

বুখারি হাদিস নং ৪০৬৩

হাদীস নং ৪০৬৩

মুহাম্মদ ইবনে মুসান্না রহ…………আবু বাকরা রা. সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সময় ও কাল আবর্তিত হয় নিজ চক্রে ও অবস্থায়। যেদিন থেকে আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। এক বছর বার মাসে হয়ে থাকে। এর মধ্যে চার মাস সম্মানিত।

তিনমাস পরপর আসে —যেমন যিলকদ, যিলহজ্জ ও মুহাররম এবং রজব মুদার যা জমাদিউল আখির ও শাবার মাসের মধ্যবর্তী সময়ে হয়ে থাকে। (এরপর তিনি প্রশ্ন করলেন) এটি কোন মাস? আমরা বললাম, আল্লাহর তাঁর রাসূলই অধিক জানেন। এরপর তিনি চুপ থাকলেন।

এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, হয়ত বা অচিরেই তিনি এ মাসের অন্য কোন নাম রাখবেন। (তারপর) তিনি বললেন, এ কি যিলহজ্জ মাস নয়? আমরা বললাম, হ্যাঁ। তারপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এটি কোন শহর? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। তারপর তিনি চুপ থাকলেন।

আমরা ধারণা করলাম যে, হয়ত বা তিনি অচিরেই এ শহরের অন্য কোন নাম রাখবেন। তারপর তিনি বললেন, এটি কি (মক্কা) শহর নয়? আমরা বললাম, হ্যাঁ। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, এ দিনটি কোন দিন? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। তারপর তিন চুপ থাকলেন।

এতে আমরা মনে করলাম যে, তিনি এ দিনটির অন্য কোন নামকরণ করবেন। তারপর তিনি বললেন, এটি কি কুরবানীর দিন নয়? আমরা বললাম, হ্যাঁ।

এরপর তিনি বললেন, তোমাদের রক্ত তোমাদের সম্পদ । রাবী মুহাম্মদ বলেন, আমার ধারণা যে, তিনি আরও বলেছিলেন, তোমাদের মান-ইজ্জত তোমাদের উপর পবিত্র, যেমন পবিত্র তোমাদের আজকের এই দিন, তোমাদের এই শহর ও তোমাদের এই মাস। তোমরা অচিরেই তোমাদের রবের সাথে মিলিত হবে।

তখন তিনি তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। খবরদার! তোমরা আমার ইন্তিকালের পর বিভ্রান্ত হয়ে পড়ো না যে, একে অপরের গর্দান মারবে। শোন, তোমাদের উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তিকে আমার গয়গাম পৌঁছে দেবে।

এটা বাস্তব যে, অনেক সময় যে প্রত্যক্ষভাবে শ্রবণ করেছে তার থেকেও প্রচারকৃত ব্যক্তি অধিকতর সংরক্ষণকারী হয়ে থাকে। রাবী মুহাম্মদ (ইবনে সীরীন রহ.) যখনই এ হাদীস বর্ণনা করতেন তখন তিনি বলতেন—মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যই বলেছেন।

তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জেনে রাখ, আমি কি (আল্লাহর বাণী তোমাদের কাছে) পৌঁছিয়ে দিয়েছি? এভাবে দু’বার বললেন।

বুখারি হাদিস নং ৪০৬৪

হাদীস নং ৪০৬৪

মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ রহ………..তারিক ইবনে শিহাব রা. থেকে বর্ণিত যে, একদল ইহুদী বলল, যদি এ আয়াত আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হত, তাহলে আমরা উক্ত অবতরণের দিনকে ঈদের দিন হিসাবে উদযাপন করতাম।

তখন উমর রা. তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, কোন আয়াত? তারা বললা, এই আয়াত: আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীন (জীবন-বিধান)-কে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করলাম।

(৫:৩) তখন উমর রা. বললেন, কোন স্থানে এ আয়াত নাযিল হয়েছিল তা আমি জানি। এ আয়াত নাযিল হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফা ময়দানে (জাবালে রহমতে) দাঁড়ানো অবস্থায় ছিলেন।

বুখারি হাদিস নং ৪০৬৫

হাদীস নং ৪০৬৫

আবদুল্লাহ ইবনে মাসলামা রহ………..আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা (মদীনা মুনাওয়ারা থেকে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে রওয়ানা হলাম।

আমাদের মধ্যে কেউ কেউ উমরার ইহরাম বেঁধেছিলেন আর কেউ কেউ হজ্জের ইহরাম, আবার কেউ কেউ হজ্জ ও উমরা উভয়ের ইহরাম বেঁধেছিলেন।

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জের ইহরাম বেঁধেছিলেন। যারা শুধু হজ্জের ইহরাম বাঁধেন অথবা হজ্জ ও উমরার ইহরাম একসঙ্গে বাঁধেন, তারা কুরবানীর দিন দশই যিলহজ্জ-এর পূর্বে হালাল হতে পারবে না।

যুদ্ধাভিযান পার্ট ১০ (অবশিষ্ট অংশ) । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৭ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৪০৬৬

হাদীস নং ৪০৬৬

আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ রহ………..মালিক রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, উপরোক্ত ঘটনা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে বিদায় হজ্জকালীন সময়ের। ইসমাঈল রহ. সূত্রেও মালিক রহ. থেকে অনুরূপ বর্ণিত আছে।

বুখারি হাদিস নং ৪০৬৭

হাদীস নং ৪০৬৭

আহমদ ইবনে ইউনুস রহ………..সাদ (ইবনে আবু ওয়াক্কাস) রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বিদায় হজ্জের সময় আমি বেদনাজনিত মরণাপন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখতে এলেন।

আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমার রোগে যে কঠিন আকার ধারণ করেছে তা আপনি দেখতেই পাচ্ছেন। আমি একজন বিত্তশালী লোক অথচ আমার একমাত্র কন্যা ব্যতীত অন্য কোন উত্তরাধিকারী নেই। এমতাবস্থায় আমি কি আমার সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ সাদকা করে দেব?

তিনি বললেন, না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তবে কি আমি এর অর্ধেক সাদকা করে দেব? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, এক-তৃতীয়াংশ, তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ, এক-তৃতীয়াংশ অনেক।

তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের সচ্ছল অবস্থায় ছেড়ে যাওয়া তাদেরকে অভাবগ্রস্থ অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম—যারা পরে মানুষের কাছে হাত পেতে বেড়াবে।

আর তুমি যা-ই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্ত খরচ কর, তার বিনিময়ে তোমাকে প্রতিদান প্রদান করা হবে। এমনকি যে লোকমা তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে ধর তারও। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমি কি আমার সাথীদের পিছনে পড়ে থাকব?

তিনি বললেন, তুমি পিছনে পড়ে থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমল করবে তা দ্বারা তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে ও সমুন্নত হবে। সম্ভবত তুমি পিছনে থেকে যাবে। ফলে তোমার দ্বারা এক সম্প্রদায় উপকৃত হবে।

অন্য সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ইয়া আল্লাহ ! আমার সাহাবীদের হিজরত আপনি জারী করে রাখুন। এবং তাদের পিছনের দিকে ফিরিয়ে দিবেন না।

কিন্তু আফসোস সাদ ইবনে খাওলা রা.-এর জন্য, (রাবী বলেন) মক্কায় তার মৃত্যু হওয়ায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

বুখারি হাদিস নং ৪০৬৮

হাদীস নং ৪০৬৮

ইবরাহীম ইবনে মুনযির রহ………..নাফি রহ. থেকে বর্ণিত, ইবনে উমর রা. তাদেরকে অবহিত করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জে তাঁর মাথা মুণ্ডন করেছিলেন।

বুখারি হাদিস নং ৪০৬৯

হাদীস নং ৪০৬৯

উবায়দুল্লাহ ইবনে সাঈদ রহ………….নাফি রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনে উমর রা. তাকে অবহিত করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জে মাথা মুণ্ডন করেন এবং তাঁর সাহাবীদের অনেকেই আর তাদের কেউ কেউ মাথার চুল ছেটে ফেলেন।

বুখারি হাদিস নং ৪০৭০

হাদীস নং ৪০৭০

ইয়াহইয়া ইবনে কাযাআ ও লায়িস রহ…………..আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি গাধায় আরোহণ করে রওয়ানা হন। এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জকালে মিনায় দাঁড়িয়ে লোকদের নিয়ে নামায আদায় করছিলেন।

তখন গাধাটি নামাযের একটি কাতারের সামনে এসে পড়ে। এরপর তিনি গাধার পিঠ থেকে অবতরণ করেন এবং তিনি লোকদের সঙ্গে নামাযের কাতারে সামিল হন।

বুখারি হাদিস নং ৪০৭১

হাদীস নং ৪০৭১

মুসাদ্দাদ রহ……………হিশামের পিতা (উরওয়া রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার উপস্থিতিতে উসামা রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিদায় হজ্জের সফর সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে বললেন, মধ্যম গতিতে চলেছেন আবার যখন প্রশস্ত পথ পেয়েছেন তখন দ্রুতগতিতে চলেছেন।

বুখারি হাদিস নং ৪০৭২

হাদীস নং ৪০৭২

আবদুল্লাহ ইবনে মাসলামা রহ…………আবু আইয়ূব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে বিদায় হজ্জে (মুযদালিফায়) মাগরিব ও ইশার নামায এক সাথে আদায় করেছেন।

যুদ্ধাভিযান পার্ট ১০ (অবশিষ্ট অংশ) । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৭ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৪০৭৩ – গাযওয়ায়ে তাবূক —আর তা কষ্টের যুদ্ধ।

হাদীস নং ৪০৭৩

মুহাম্মদ ইবনে আলা রহ………….আবু মূসা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার সাথীরা আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পাঠালেন তাদের জন্য যানবাহন চাওয়ার জন্য। কারণ তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে কঠিনতর যুদ্ধ অর্থাৎ তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণেচ্ছু ছিলেন।

অনন্তর আমি এসে বললাম, হে আল্লাহর নবী ! আমার সাথীরা আমাকে আপনার সমীপে এ জন্য পাঠিয়েছেন যে, আপনি যেন তাদের জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা করেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের জন্য কোন যানবাহনের ব্যবস্থা করতে পারব না।

আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি রাগান্বিত। অথচ আমি তা অবগত নই। আর আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যানবাহন না দেয়ার কারণে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ফিরে আসি। আবার এ ভয়ও ছিল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হৃদয়ে আমার প্রতি না আবার অসন্তোষ আসে।

তাই আমি সাথীদের কাছে ফিরে যাই এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন তা আমি তাদের অবহিত করে। পরক্ষণেই শুনতে পেলাম যে বিলাল রা. ডাকছেন এ বলে যে, আবদুল্লাহ ইবনে কায়েস কোথায়? তখন আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিলাম।

তখন তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে ডাকছেন, আপনি উপস্থিত হন। আমি যখন তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম তখন তিনি বললেন, এই জোড়া এবং ঐ জোড়া এমনি ছয়টি উটনী যা সাদ থেকে ক্রয় করা হয়েছে, তা গ্রহণ কর। এবং সেগুলো তোমার সাথীদের কাছে নিয়ে যাও।

এবং বল যে, আল্লাহ তায়ালা (রাবীর সন্দেহ) অথবা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলো তোমাদের যাহবাহনের জন্য ব্যবস্থা করেছেন, তোমরা এগুলোর উপর আরোহণ কর।

এরপর আমি সেগুলোসহ তাদের কাছে গেলাম এবং বললাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলোকে তোমাদের বাহন হিসেবে দিয়েছেন। আল্লাহর কসম ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা যারা শুনেছিল আমার সাথে তোমাদের কেউ এমন কারুর কাছে না যাওয়া পর্যন্ত আমি তোমাদের চলে যেতে দিতে পারি না।

যাতে তোমরা এমন ধারণা না কর যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেননি আমি তা তোমাদের বর্ণনা করেছি। তখন তারা আমাকে এমন ধারণা না করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেননি আমি তা তোমাদের বর্ণনা করেছি।

তখন তারা আমাকে বললেন, আল্লাহর কসম, আপনি আমাদের কাছে সত্যবাদী বলে খ্যাত। তবুও আপনি পছন্দ করেন আমরা অবশ্য করব।

অনন্তর আবু মূসা রা. তাদের মধ্যকার একদল লোককে সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অপারগতা প্রকাশ এবং পরে তাদেরকে দেয়ার কথা শুনেছিলেন, তাদের কাছে আসেন। এরপর তাদের কাছে সেরূপ ঘটনা বর্ণনা করলেন যেমন আবু মূসা আশআরী রা. বর্ণনা করেছিলেন।

বুখারি হাদিস নং ৪০৭৪

হাদীস নং ৪০৭৪

মুসাদ্দাদ রহ………….মুসআব ইবনে সাদ তাঁর পিতা (আবু ওয়াক্কাস) রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক যুদ্ধাভিযানে রওয়ানা হন। আর আলী রা.-কে খলীফা মনোনীত করেন।

আলী রা. বলেন, আপনি কি আমাকে শিশু ও মহিলাদের মধ্যে ছেড়ে যাচ্ছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি এ কথায় রাযী নও যে তুমি আমার কাছে সে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবে যেমন হারূন আ. মূসা আ.-এর পক্ষ থেকে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

তবে এতটুকু পার্থক্য যে, (তিনি নবী ছিলেন আর) আমার পরে কোন নবী নেই। আবু দাউদ রহ. বলেন, শুবা রহ. আমাকে হাকাম রহ. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি মুসআব রহ. থেকে শুনেছি।

যুদ্ধাভিযান পার্ট ১০ (অবশিষ্ট অংশ) । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৭ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৪০৭৫

হাদীস নং ৪০৭৫

উবায়দুল্লাহ ইবনে সাঈদ রহ……….সাফওয়ান -এর পিতা ইয়ালা ইবনে উমাইয়া রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে উসরা-এর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ইয়ালা বলতেন যে, উক্ত যুদ্ধ আমার কাছে নির্ভরযোগ্য আমলের অন্যতম বলে বিবেচিত হত।

আতা রহ. বলেন যে, সাফওয়ান বলেছেন, ইয়ালা রা. বর্ণনা করেন, আমার একজন (দিনমজুর) চাকর ছিল, সে একবার এক ব্যক্তির সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হল এবং একপর্যায়ে একজন অন্যজনের হাত দাঁত দ্বারা কেটে ফেলল।

আতা রা. বলেন, আমাকে সাফওয়ান রহ. অবহিত করেছেন যে, উভয়ের মধ্যে কে কার হাত দাঁত দ্বারা কেটেছিল তার নাম আমি ভুলে গেছি।

রাবী বলেন, আহত ব্যক্তি ঘাতকের মুখ থেকে নিজ হাত মুক্ত করার পর দেখা গেল, তার সম্মুখের দুটো দাঁত উৎপাটিত হয়ে গেছে। তারপর তারা এ মামলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমীপে পেশ করে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দাঁতের ক্ষতিপূরণের দাবি বাতিল করেছেন।

আতা বলেন যে, আমার ধারণা যে বর্ণনাকারী এ কথাও বলেছেন যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তবে কি সে তার হাত তোমার মুখে চিবানোর জন্য ছেড়ে দিবে? যেমন উটের মুখে চিবানোর জন্য ছেড়ে দেয়া হয়?

বুখারি হাদিস নং ৪০৭৬ – কাব ইবনে মালিকের ঘটনা এবং মহান আল্লাহর বাণী: এবং তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিন জনকেও যাদের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল।(৯: ১১৮)

হাদীস নং ৪০৭৬ – কাব ইবনে মালিকের ঘটনা এবং মহান আল্লাহর বাণী: এবং তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিন জনকেও যাদের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল।(৯: ১১৮)

ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর রহ………….আবদুল্লাহ ইবনে কাব ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, কাব রা. অন্ধ হয়ে গেলে তাঁর সন্তানদের মধ্য থেকে যিনি তাঁর সাহায্যকারী ও পথ-প্রদর্শনকারী ছিলেন, তিনি বলেন,

বলেন, আমি কাব ইবনে মালিক রা.-কে বলতে শুনেছি, যখন তাবুক যুদ্ধ থেকে তিনি পশ্চাতে থেকে যান তখনকার অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যতগুলো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তার মধ্যে তাবূক যুদ্ধ ছাড়া আমি আর কোন যুদ্ধ থেকে পেছনে থাকিনি।

তবে আমি বদর যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করিনি। কিন্তু উক্ত যুদ্ধ থেকে যারা পেছনে পড়ে গেছেন, তাদের কাউকে ভর্ৎসনা করা হয়নি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল কুরাইশ দলের সন্ধানে বের হয়েছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা তাদের এবং তাদের শত্রু বাহিনীর মধ্যে অঘোষিত যুদ্ধ সংঘটিত করেন।

আর আমি আকাবা রজনীতে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের থেকে ইসলামের উপর অঙ্গীকার গ্রহণ করেন, আমি তখন তাঁর সঙ্গে ছিলাম। ফলে বদর প্রান্তরের উপস্থিতিকে আমি প্রিয়তর ও শ্রেষ্ঠতর বলে বিবেচনা করিনি।

যদিও আকাবার ঘটনা অপেক্ষা লোকদের মধ্যে বদরের ঘটনা প্রসিদ্ধ ছিল। আর আমার অবস্থার বিবরণ এই—তাবূক যুদ্ধ থেকে আমি যখন পেছনে থাকি তখন আমি এত অধিক সুস্থ, শক্তিশালী ও সচ্ছল ছিলাম যে আল্লাহর কসম, আমার কাছে কখনো ইতিপূর্বে কোন যুদ্ধে একই সাথে দুটো যানবাহন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি, যা আমি এ যুদ্ধের সময় সংগ্রহ করেছিলাম।

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে অভিযান পরিচালনার সংকল্প গ্রহণ করতেন, দৃশ্যত তার বিপরীত ভাব দেখাতেন।

এ যুদ্ধ ছিল ভীষণ উত্তাপের সময়, অতি দূরের সফর, বিশাল মরুভূমি এবং অধিক সংখ্যক শত্রু সেনার মুকাবিলা করার। কাজেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অভিযানের অবস্থা মুসলমানদের কাছে প্রকাশ করে দেন যেন তারা যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সম্বল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গী লোক সংখ্যা ছিল অধিক যাদের হিসাব কোন রেজিস্ট্রারে লিখিত ছিল না। কাব রা. বলেন, যার ফলে যেকোন লোক যুদ্ধাভিযান থেকে বিরত থাকতে ইচ্ছা করলে তা সহজেই করতে পারত এবং ওহী মারফত এ খবর পরিজ্ঞাত না করা পর্যন্ত তা সংগোপন থাকবে বলে সে ধারণা করত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন এমন সময় যখন ফল-ফলাদি পাকার ও গাছের ছায়ায় আরাম উপভোগের সময় ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং এবং তাঁর সঙ্গী মুসলিম বাহিনী অভিযানে যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণ করে ফেলেন।

আমিও প্রতি সকালে তাদের সঙ্গে রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকি। কিন্তু কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারিনি। মনে মনে ধারণা করতে থাকি, আমি তো যখন ইচ্ছা যেতে সক্ষম। এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আমার সময় কেটে যেতে লাগল।

এদিকে অন্য লোকেরা পুরাপুরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলল। ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাথী মুসলিমগণ রওয়ানা করলেন অথচ কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। আমি মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা ঠিক আছে, এক দুদিনের মধ্যে আমি প্রস্তুত হয়ে পরে তাদের সঙ্গে মিলিত হব।

এভাবে আমি প্রতিদিন বাড়ি হতে প্রস্তুতিপর্ব সম্পন্ন করার মানসে বের হই, কিন্তু কিছু না করেই ফিরে আসি। আবার বের হই, আবার কিছু না করে ঘরে ফিরে আসি। ইত্যবসরে বাহিনী অগ্রসর হয়ে অনেক দূর চলে গেল। আর আমি রওয়ানা করে তাদের সাথে পথে মিলে যাবার ইচ্ছা পোষণ করতে থাকলাম।

যুদ্ধাভিযান পার্ট ১০ (অবশিষ্ট অংশ) । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৭ম খণ্ড

আফসোস যদি আমি তাই করতাম। কিন্তু তা আমার ভাগ্যে জোটেনি। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওয়ানা হওয়ার পর আমি লোকদের মধ্যে বের হয়ে তাদের মাঝে বিচরণ করতাম।

একথা আমার মনেকে পীড়া দিত যে, আমি তখন (মদীনায়) মুনাফিক এবং দুর্বল ও অক্ষম লোক ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে পেতাম না। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবূক পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত আমার কথা আলোচনা করেননি। অনন্তর তাবূকে একথা তিনি জনতার মধ্যে উপবিষ্টাবস্থায় জিজ্ঞাসা করে বসলেন, কাব কি করল?

বনী সালমা গোত্রের এক লোক বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ধন-সম্পদ ও আত্মগরিমা তাকে আসতে দেয়নি। একথা শুনে মুআয ইবনে জাবাল রা. বললেন, তুমি যা বললে তা ঠিক নয়। ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কসম, আমরা তাকে উত্তম ব্যক্তি বলে জানি।

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব রইলেন। কাব ইবনে মালিক রা. বলেন, আমি যখন অবগত হলাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা মুনাওয়ারার দিকে প্রত্যাবর্তন করেছেন, তখন আমি চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়লাম এবং মিথ্যার বাহানা খুঁজতে থাকলাম।

মনে স্থির করলাম, আগামীকাল এমন কথা বলব যাতে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ক্রোধকে প্রশমিত করতে পারি।

আর এ সম্পর্কে আমার পরিবারস্থ জ্ঞানীগুণীদের থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতে থাকি।এরপর যখন প্রচারিত হল যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় এসে পৌঁছে যাচ্ছেন, তখন আমার অন্তর থেকে মিথ্যা তিরোহিত হয়ে গেল।

আর মনে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মাল যে, এমন কোন পন্থা অবলম্বন করে আমি তাকে কখনো ক্রোধমুক্ত করতে সক্ষম হব না, যাতে মিথ্যার নামগন্ধ থাকে। অতএব আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম যে, আমি সত্যই বলব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রভাতে মদীনায় পদার্পণ করলেন।

তিনি সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করে প্রথমে মসজিদে গিয়ে দু’রাকআত নামায আদায় করতেন, তারপর লোকদের সামনে বসতেন। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করলেন, তখন যারা পশ্চাদপদ ছিলেন তাঁরা তাঁর কাছে কাছে এসে শপথ করে করে অক্ষমতা ও আপত্তি পেশ করতে লাগল।

এরা সংখ্যায় আশির অধিক ছিল। অনন্তর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহ্যিকভাবে তাদের ওযর-আপত্তি গ্রহণ করলেন, তাদের বায়আত করলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।

কিন্তু তাদের অন্তর্নিহিত অবস্থা আল্লাহর হাওয়ালা করে দিলেন। (কাব রা. বলেন) আমিও এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত হলাম। আমি যখন তাকে সালাম দিলাম তখন তিনি রাগান্বিত চেহারায় মুচকি হাসি হাসলেন। তারপর বললেন, এস।

আমি সে অনুসারে অগ্রসর হয়ে একেবারে তাঁর সম্মুখে বসে গেলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি কারণে তুমি অংশগ্রহণ করলে না? তুমি কি যানবাহন ক্রয় করনি? তখন আমি বললাম, হ্যাঁ, করেছি।

আল্লাহর কসম, এ কথা সুনিশ্চিত যে, আমি যদি আপনি ছাড়া অন্য কোন দুনিয়াদার ব্যক্তির সামনে বসতাম তাহলে আমি তার অসন্তুষ্টিকে ওযর-আপত্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রশমিত করার প্রয়াস চালাতাম। আর আমি তর্কে সিদ্ধহস্ত।

কিন্তু আল্লাহর কসম আমি পরিজ্ঞাত যে, আজ যদি আমি আপনার কাছে মিথ্যা কথা বলে আমার প্রতি আপনাকে রাযী করার চেষ্টা করি তাহলে অচিরেই আল্লাহ তায়ালা আপনাকে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দিতে পারেন। আর যদি আপনরার কাছে সত্য প্রকাশ করি যাতে আপনি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন, তবুও আমি এতে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার নির্ঘাত আশা রাখি।

না, আল্লাহর কসম, আমার কোন ওযর ছিল না। আল্লাহর কসম, সেই অভিযানে আপনার সাথে না যাওয়াকালীন সময় আমি সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান ছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে সত্য কথাই বলেছে।

তুমি এখন চলে যাও, যতদিনে না তোমার সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ফায়সালা করে দেন। তাই আমি উঠে চলে গেলাম। তখন বনী সালিমার কতিপয় লোক আমার অনুসরণ করল। তারা আমাকে বলল, আল্লাহর কসম, তুমি ইতিপূর্বে কোন গুনাহ করেছ বলে আমাদের জানা নেই।

তুমি কি অন্যান্য পশ্চাদগামীর মত তোমার অক্ষমতার একটি ওযর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পেশ করে দিতে পারতে না? আর তোমার এ অপরাধের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনাই তো যথেষ্ট ছিল।

আল্লাহর কসম তারা আমাকে অনবরত কঠিনভাবে ভর্ৎসনা করতে থাকে। ফলে আমি পূর্বে স্বীকারোক্তি থেকে প্রত্যাবর্তন করে মিথ্যা বলার বিষয়ে মনে মনে চিন্তা করতে থাকি। এরপর আমি তাদের বললাম, আমার মত এ কাজ আর কেউ করেছে কি? তারা জওয়াব দিল, হ্যাঁ, আরও দু’জন তোমার মত বলেছে।

এবং তাদের ক্ষেত্রেও তোমার মত একই রূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, তারা কে কে ? তারা বলল, একজন মুরারা ইবনে রবী আমরী এবং অপরজন হলেন, হিলাল ইবনে উমায়্যা ওয়াকিফী। এরপর তারা আমাকে অবহিত করল যে, তারা উভয়ে উত্তম মানুষ এবং তারা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।

সেজন্য উভয়ে আদর্শবাদ। যখন তারা তাদের নাম উল্লেখ করল, তখন আমি পূর্ব মতের উপর অটল রইলাম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মধ্যকার যে তিনজন তাবূকে অংশগ্রহণ হতে বিরত ছিল তাদের সাথে কথা বলতে মুসলমানদের নিষেধ করে দিলেন।

তদনুসারে মুসলমানরা আমাদের পরিহার করে চলল। আমাদের প্রতি তাদের আচরণ পরিবর্তন করে নিল। এমনকি এদেশ যেন আমাদের কাছে অপরিচিত হয়ে গেল। এ অবস্থায় আমরা পঞ্চাশ রাত অতিবাহিত করলাম। আমার অপর দু’জন সাথী তো সংকট ও শোচনীয় অবস্থায় নিপতিত হলেন।

তারা নিজেদের ঘরে বসে বসে কাঁদতে থাকেন। আর আমি যেহেতু অধিকতর যুবক ও শক্তিশালী ছিলাম তাই বাইরে বের হয়ে আসতাম, মুসলমানদের জামাআতে নামায আদায় করতাম। এবং বাজারে চলাফেরা করতাম কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলত না।

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে হাযির হয়ে হয়ে তাকে সালাম দিতাম। যখন তিনি নামায শেষে মজলিসে বসতেন তখন আমি মনে মনে বলতাম ও লক্ষ্য করতাম, তিনি আমার সালামের জবাবে তার ঠোটদ্বয় নেড়েছেন কি না।

তারপর আমি তাঁর নিকটবর্তী স্থানে নামায আদায় করতাম এবং গোপন দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেন। এভাবে আমার প্রতি লোকদের কঠোরতা ও এড়িয়ে চলার আচরণ দীর্ঘকাল ধরে বিরাজমান থাকে।

একদা আমি আমার চাচাত ভাই ও প্রিয় বন্ধু আবু কাতাদা রা.-এর বাগানের প্রাচীর টপকে প্রবেশ করে তাকে সালাম দেই। কিন্তু আল্লাহর কসম তিনি আমার সালামের জওয়াব দিলেন না।

আমি তখন বললাম, হে আবু কাতাদা, আপনাকে আমি আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি, আপনি কি জানেন যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে ভালবাসি? তখন তিনি নীরবতা পালন করলেন। আমি পুনরায় তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

তিনি এবারও কোন জবাব দিলেন না। আমি পুনঃ (তৃতীয়বারও) তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই ভাল জানেন। তখন আমার চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। অগত্যা আমি পুনরায় প্রাচীর টপকে ফিরে এলাম।

কাব রা. বলেন, একদা আমি মদীনার বাজারে বিচরণ করছিলাম। এমতাবস্থায় সিরিয়ার এক কৃষক বণিক যে মদীনার বাজারে খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করার উদ্দেশ্যে এসেছিল, সে বলছে, আমাকে কাব ইবনে মালিককে কেউ পরিচয় করে দিতে পারে কি? তখন লোকেরা তাকে আমার প্রতি ইশারায় দেখাচ্ছিল।

তখন সে এসে গাসসানি বাদশার একটি পত্র আমার কাছে হস্তান্তর করল। তাতে লেখা ছিল, পর সমাচার এই, আমি জানতে পারলাম যে, আপনার সাথী আপনার প্রতি জুলুম করেছে।

আর আল্লাহ আপনাকে মর্যাদাহীন ও আশ্রয়হীন করে সৃষ্টি করেননি। আপনি আমাদের দেশে চলে আসুন, আমরা আপনার সাহায্য-সহানুভূতি করব। আমি যখন এ পত্র পড়লাম তখন আমি বললাম, এটাও আর একটি পরীক্ষা। তখন আমি চুলা খোঁজ করে তার মধ্যে পত্রটি নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দিলাম।

এ সময় পঞ্চাশ দিনের চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে এক সংবাদ বাহক আমার কাছে এসে বলল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি আপনার স্ত্রী হতে পৃথক থাকবেন।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি তাকে তালাক দিয়ে দিব, না অন্য কিছু করব? তিনি উত্তর দিলেন, তালাক দিতে হবে না বরং তার থেকে পৃথক থাকুন এবং তার নিকটবর্তী হবেন না। আমার অপর দু’জন সঙ্গীর প্রতি একই আদেশ পৌঁছালেন। তখন আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি তোমার পিত্রালয়ে চলে যাও।

আমার এ ব্যাপারে আল্লাহর ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত তুমি তথায় অবস্থান কর। কাব রা. বলেন, আমার সঙ্গী হিলাল ইবনে উমায়্যার স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! হিলাল ইবনে উমায়্যা অতি বৃদ্ধ, এমন বৃদ্ধ যে, তাঁর কোন খাদিম নেই। আমি তাঁর খেদমত করি, এটা কি আপনি অপছন্দ করেন?

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না তবে সে তোমার বিছানায় আসতে পারবে না। সে বলল, আল্লাহর কসম, এ সম্পর্কে তার কোন অনুভূতিই নেই।

আল্লাহর কসম, তিনি এ নির্দেশ পাওয়া অবধি সর্বদা কান্নাকাটি করছেন। (কাব রা বলেন) আমার পরিবারের কেউ আমাকে পরামর্শ দিল যে, আপনিও যদি আপনার স্ত্রী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অনুমতি চাইতেন যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিলাল ইবনে উমায়্যার স্ত্রীকে তার (স্বামীর) খেদমত করার অনুমতি চাইব না।

আমি যদি তার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুমতি চাই তবে তিনি কি বলেন, তা আমার জানা নেই।

যুদ্ধাভিযান পার্ট ১০ (অবশিষ্ট অংশ) । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৭ম খণ্ড

আমি তো নিজেই আমার খেদমতে সক্ষম। এরপর আরও দশ রাত অতিবাহিত করলাম। এভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন থেকে আমাদের সাথে কথা বলতে নিষেধ করেন তখন থেকে পঞ্চাশ রাত পূর্ণ হল।

এরপর আমি পঞ্চাশতম রাত শেষে ফজরের নামায আদায় করলাম এবং আমাদের এক ঘরের ছাদে এমন অবস্থায় বসে ছিলাম যা আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করেছেন।

আমার জান-প্রাণ দুর্বিষহ এবং গোটা জগতটা যেন আমার জন্য প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় শুনতে পেলাম এক চীৎকারকারীর চীৎকার। সে সালা পাহাড়ের উপর চড়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করছে, হে কাব ইবনে মালিক। সুসংবাদ গ্রহণ করুন।

কাব রা বলেন, এ শব্দ আমার কানে পৌঁছামাত্র আমি সিজদায় লুটে পড়লাম। আর আমি অনুভব করলাম যে আমার সুদিন ও খুশীর খবর এসেছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামায আদায়ের পর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে আমাদের তাওবা কবুল হওয়ার সুসংবাদ প্রকাশ করেন। তখন লোকেরা আমার এবং আমার সঙ্গী দ্বয়ের কাছে সুসংবাদ পরিবেশন করতে থাকে।

এবং তড়িঘড়ি একজন অশ্বারোহী লোক আমার কাছে আসে এবং আসলাম গোত্রের অপর এক ব্যক্তি দ্রুত আগমন করে পাহাড়ের উপর আরোহণ করত চীৎকার দিতে থাকে।

তার চিৎকারের শব্দ ঘোড়া অপেক্ষাও দ্রুত পৌঁছল। যার শব্দ আমি শুনেছিলাম সে যখন আমার কাছে সুসংবাদ প্রদান করতে আসল, আমি তখন আমার নিজের পরিধেয় দুটো কাপড় তাকে সুসংবাদ দেয়ার জন্য দান করলাম। আর আমি আল্লাহর কসম করে বলছি যে, ঐ সময় সেই দুটো কাপড় ছাড়া আমার কাছে আর কোন কাপড় ছিল না।

আমি দুটো কাপড় ধার করে পরিধান করলাম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে রওয়ানা হলাম। লোকেরা দলে দলে আমাকে ধন্যবাদ জানাতে আসতে লাগল। তারা তাওবা কবূলের মুবারকবাদ জানাচ্ছিল। তারা বলছিল, তোমাকে মুবারকবাদ যে আল্লাহ তায়ালা তোমার তাওবা কবূল করেছেন।

কাব রা. বলেন, অবশেষে আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে বসা ছিলেন এবং তাঁর চতুষ্পার্শ্বে জনতার সমাবেশ ছিল। তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ রা দ্রুত উঠে এসে আমার সাথে মুসাফাহা করলেন ও মুবারকবাদ জানালেন।

আল্লাহর কসম তিনি ব্যতীত আর কোন মুহাজির আমার জন্য দাঁড়াননি। আমি তালহার ব্যবহার ভুলতে পারব না। কাব রা. বলেন, এরপর আমি যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সালাম জানালাম, তখন তাঁর চেহারা আনন্দের আতিশয্যে ঝকঝক করছিল।

তিনি আমাকে বললেন, তোমার মাতা তোমাকে জন্মদানের দিন হতে যতদিন তোমার উপর অতিবাহিত হয়েছে তার মধ্যে উৎকৃষ্ট ও উত্তম দিনের সুসংবাদ গ্রহণ কর।

কাব বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা কি আপনার পক্ষ থেকে না আল্লাহর পক্ষ থকে ? তিনি বললেন, আমার পক্ষ থেকে নয় বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খুশী হতেন তখন তাঁর চেহারা এত উজ্জ্বল ও প্রোজ্জ্বল হত সে যেন পূর্ণিমার চাঁদের ফালি।

এতে আমরা তাঁর সন্তুষ্টি বুঝতে পারতাম। আমি যখন তাঁর সম্মুখে বসলাম তখন আমি আরয করলাম ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার তাওবা কবূলের শুকরিয়া স্বরূপ আমার ধন-সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পথে দান করত চাই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কিছু মাল তোমার কাছে রেখে দাও। তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, খায়বরে অবস্থিত আমার অংশটি আমার জন্য রাখলাম।

আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ! আল্লাহ তায়ালা সত্য বলার কারণে আমাকে রক্ষা করেছেন, তাই আমার তাওবা কবূলের নিদর্শন অক্ষুন্ন রাখতে আমার অবশিষ্ট জীবনে সত্যই বলব।

আল্লাহর কসম, যখন থেকে আমি এ সত্য বলার কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানিয়েছি, তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমার জানামতে কোন মুসলিমকে সত্য কথার বিনিময়ে এরূপ নিয়ামত আল্লাহ দান করেননি যে, নিয়ামত আমাকে দান করেছেন (কাব রা. বলেন) যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে সত্য কথা বলেছি সেদিন হতে আজ পর্যন্ত অন্তরে মিথ্যা বলার ইচ্ছাও করিনি।

যুদ্ধাভিযান পার্ট ১০ (অবশিষ্ট অংশ) । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৭ম খণ্ড

আমি আশা পোষণ করি যে, বাকী জীবনও আল্লাহ তায়ালা আমাকে মিথ্যা থেকে হিফাজত করবেন। এরপর আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর এই আয়াত নাযিল করেন ‘আল্লাহ অনুগ্রহ পরায়ণ হলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি এবং মুহাজিরদের প্রতি………এবং তোমরা সত্যবাদীদের অন্তর্ভূক্ত হও’।

(৯: ১১৭-১১৯) (কাব রা. বলেন) আল্লাহর শপথ, ইসলাম গ্রহণের পর থেকে কখনো আমার উপর এত উৎকৃষ্ট নিয়ামত আল্লাহ প্রদান করেননি যা আমার কাছে শ্রেষ্ঠতর, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আমার সত্য বলা ও তাঁর সাথে মিথ্যা না বলা, যদি মিথ্যা বলতাম তবে মিথ্যাবাদীদের মত আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম।

সেই মিথ্যাবাদীদের সম্পর্কে যখন ওহী নাযিল হয়েছে তখন জঘন্য অন্তরের সেই লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : তোমরা তাদের নিকট ফিরে আসলে তারা আল্লাহর শপথ করবে…………আল্লাহ সত্য ত্যাগী সম্প্রদায়ের প্রতি তুষ্ট হবেন না।

(৯: ৯৫-৯৬)। কাব রা বলেন, আমাদের তিনজনের তাওবা কবূল করতে বিলম্ব করা হয়েছে—যাদের তাওবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবূল করেছেন যখন তাঁরা তার কাছে শপথ করেছে, তিনি তাদের বায়আত গ্রহণ করেছেন, এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।

আমাদের বিষয়টি আল্লাহর ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্থগিত রেখেছেন। এর প্রেক্ষাপটে আল্লাহ বলেন—সেই তিনজনের প্রতিও যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল।

(৯: ১১৮) কুরআনের এই আয়াতে তাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়নি যারা তাবূক যুদ্ধ থেকে পিছনে ছিল ও মিথ্যা কসম করে ওযর-আপত্তি পেশ করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও তা গ্রহণ করেছিলেন।

বরং এই আয়াতে তাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে আমরা যারা পেছনে ছিলাম এবং যাদের প্রতি সিদ্ধান্ত দেয়া স্থগিত রাখা হয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ

শাহাদাত অধ্যায় পার্ট ১ । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৪র্থ খণ্ড

শাহাদাত অধ্যায় পার্ট ২ । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৪র্থ খণ্ড

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় ১ম পার্ট- সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় ২য় পার্ট- সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় ৩য় পার্ট । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৬ষ্ঠ খণ্ড

সহিহ বুখারী

মন্তব্য করুন