মাগাযী (যুদ্ধাভিযান) অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

মাগাযী (যুদ্ধাভিযান) অধ্যায়

মাগাযী (যুদ্ধাভিযান) অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

মাগাযী (যুদ্ধাভিযান) অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৭৪৩ – আবু রাফি আবদুল্লাহ ইবনে আবুল হুকায়কের হত্যা।

হাদীস নং ৩৭৪৩

ইসহাক ইবনে নাসর রহ……….বারা ইবনে আযিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ জনের কম একটি দলকে আবু রাফির উদ্দেশ্যে পাঠালেন।

(তাদের মধ্যে) আবদুল্লাহ ইবনে আতীক রা. রাতের বেলা তার ঘরে প্রবেশ করে ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে হত্যা করেন।

মাগাযী (যুদ্ধাভিযান) অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৭৪৪

হাদীস নং ৩৭৪৪

ইউসুফ ইবনে মূসা রহ…………বারা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে আতীককে আমীর বানিয়ে তার নেতৃত্বে আনসারদের কতিপয় সাহাবীকে ইয়াহূদী আবু রাফির (হত্যার) উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন।

আবু রাফি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কষ্ট দিত এবং এ ব্যাপারে লোকদেরকে সাহায্য করত। হিজায ভূমিতে তার একটি দুর্গ ছিল।

(সে সেখানে বসবাস করত) তারা যখন তার দুর্গের কাছে গিয়ে পৌঁছলেন তখন সূর্য ডুবে গিয়েছে এবং লোকজন নিজেদের পশু পাল নিয়ে রওয়ানা হয়েছে (নিজ নিজ বাড়ীর দিকে) আবদুল্লাহ (ইবনে আতীক) তার সাথীদেরকে বললেন, তোমরা তোমাদের স্থানে বসে থাক।

আমি চললাম ভিতরে প্রবেশ করার জন্য দ্বার রক্ষীর সাথে আমি (কিছু) কৌশল প্রদর্শন করব। এরপর তিনি সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজার কাছে পৌঁছলেন এবং কাপড় দ্বারা নিজেকে এমনভাবে ঢাকলেন যেন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে রত আছেন।

তখন সবাই ভিতরে প্রবেশ করলে দ্বাররক্ষী তাকে ডেকে বলল, হে আবদুল্লাহ ভিতরে প্রবেশ করতে চাইলে প্রবেশ কর। আমি এখনই দরজা বন্ধ করে দেব।

আমি তখন ভিতরে প্রবেশ করলাম এবং আত্মগোপন করে রইলাম। সকলে ভিতরে প্রবেশ করার পর সে দরজা বন্ধ করে দিল এবং একটি পেরেকের সাথে চাবিটা লটকিয়ে রাখল। (আবদুল্লাহ ইবনে আতীক রা. বলেন) এরপর আমি চাবিটার দিকে এগিয়ে গেলাম এবং চাবিটা নিয়ে দরজাটি খুললাম।

আবু রাফির নিকট রাতের বেলা গল্পের আসর জমতো, এ সময় সে তার উপর তলার কামরায় অবস্থান করছিল। গল্পের আসরে আগত লোকজন চলে গেলে, আমি সিঁড়ি বেয়ে তার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম।

এ সময় আমি একটি করে দরজা খুলছিলাম এবং ভিতরে থেকে তা আবার বন্ধ করে দিয়ে যাচ্ছিলাম, যাতে লোকজন আমার (আগমন) সম্বন্ধে জানতে পারলেও হত্যা না করা পর্যন্ত আমার নিকট পৌঁছতে না পারে।

আমি তার কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। এ সময় সে একটি অন্ধকার কক্ষে ছেলেমেয়েদের মাঝে শুয়েছিল। কক্ষের কোন অংশে সে শুয়ে আছে আমি তা বুঝতে পারছিলাম না। তাই আবু রাফি বলে ডাক দিলাম।

সে বলল, কে আমাকে ডাকছ? আমি তখন আওয়াজটি লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে তরবারী দ্বারা প্রচন্ড জোরে আঘাত করলাম। আমি তখন কাঁপছিলাম এ আঘাতে আমি তাকে কোন কিছুই করতে পারলাম না। সে চীৎকার করে উঠলে আমি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে চলে আসলাম।

এরপর পুনরায় ঘরে প্রবেশ করে (কন্ঠস্বর পরিবর্তন করত: তার আপন লোকের ন্যায়) জিজ্ঞাসা করলাম, আবু রাফি এ আওয়াজ হল কিসের ?

সে বলল, তোমার মায়ের সর্বনাশ হোক। কিছুক্ষণ পূর্বে ঘরের ভিতর কে যেন আমাকে তরবারী দ্বারা আঘাত করেছে। আবদুল্লাহ ইবনে আতীক রা. বলেন, তখন আমি আবার তাকে ভীষণ আঘাত করলাম এবং মারাত্মকভাবে ক্ষত বিক্ষত করে ফেললাম। কিন্তু তাকে হত্যা করতে পারিনি।

মাগাযী (যুদ্ধাভিযান) অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

তাই তরবারীর ধারাল দিকটি তার পেটের উপর চেপে ধরলাম এবং পিঠ পার করে দিলাম। এবার আমি নিশ্চিত রূপে অনুভব করলাম যে, এখন আমি তাকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছি।

এরপর আমি এক এক করে দরজা খুলে নিচে নামতে শুরু করলাম নামতে নামতে সিঁড়ির শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছলাম। পূর্ণিমার রাত্র ছিল। (চাঁদের আলোতে তাড়াহুড়ার মধ্যে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পেরে) আমি মনে করলাম, (সিঁড়ির সকল ধাপ অতিক্রম করে) আমি মাটির নিকটে এসে পড়েছি।

(কিন্তু তখনও একটি ধাপ অবশিষ্ট ছিল) তাই নিচে পা রাখতেই পড়ে গেলাম। অমনিই আমার পায়ের গোছার হাড় ভেঙ্গে গেল।

(তাড়াহুড়া করে) আমি আমার মাথার পাগড়ি দ্বারা পা খানা বেঁধে নিলাম এবং একটু হেটে গিয়ে দরজা সোজা বসে রইলাম মনে সিদ্ধান্ত করলাম, তার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত অবগত না হয়ে আজ রাতে আমি এখান থেকে যাব না।

ভোর রাতে মোরগের ডাক আরম্ভ হলে মৃত্যু ঘোষণাকারী প্রাচীরের উপর উঠে ঘোষণা করল, হিজায অধিবাসীদের অন্যতম ব্যবসায়ী আবু রাফির মৃত্যু সংবাদ গ্রহণ কর।

তখন আমি আমার সাথীদের নিকট গিয়ে বললাম, দ্রুত চল, আল্লাহ আবু রাফিকে হত্যা করেছেন। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলাম এবং সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম।

তিনি বললেন, তোমার পাটি লম্বা করে দাও। আমি আমার পাটি লম্বা করে দিলে তিনি উহার উপর স্বীয় হাত বুলিয়ে দিলেন। (এতে আমার পা এমন সুস্থ হয়ে গেল) যেন তাতে কোন আঘাতই পায়নি।

মাগাযী (যুদ্ধাভিযান) অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৭৪৫

হাদীস নং ৩৭৪৫

আহমদ ইবনে উসমান রহ………….বারা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু রাফির (হত্যার) উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহ ইবনে আতীক ও আবদুল্লাহ ইবনে উতবাকে একদল লোকসহ প্রেরণ করেন।

যেতে যেতে তারা দুর্গের কাছে গিয়ে পৌঁছলে আবদুল্লাহ ইবনে আতীক রা. তাদেরকে বললেন, তোমরা অপেক্ষা কর। আমি যাই, দেখি কি করে সুযোগ করা যায়।

আবদুল্লাহ আতীক রা বলেন, দুর্গের ভিতর প্রবেশ করার জন্য আমি কৌশল অবলম্বন করব। ইতিমধ্যে তারা একটি গাধা হারিয়ে ফেলল, এবং একটি আলো নিয়ে এর সন্ধানে বের হল।

তিনি বলেন, আমকে চিনে ফেলবে আমি এ আশংকা করছিলাম। তাই (কাপড় দিয়ে) আমি আমার মাথা ও পা ঢেকে ফেললাম এবং এমনভাবে বসে রইলাম যেন আমি প্রাকৃতিক আবশ্যক মলমূত্র এখনই দরজা বন্ধ করার আগে ভিতরে ঢুকে পড়ুন।

আমি প্রবেশ করলাম এবং দুর্গের দরজার পার্শ্বে গাধা বাঁধার স্থানে আত্মগোপন করে থাকলাম। আবু রাফির নিকট সবাই বসে রাতে খানা খেয়ে গল্প গুজব করল।

এভাবে রাতের কিছু অংশ কেটে যাওয়ার পর সকলেই নিজ নিজ বাড়ীতে চলে গেল। যখন কোলাহল থেমে গেল এবং কোন নড়াচড়া শুনতে পাচ্ছিলাম না। তখন আমি বের হলাম। আবদুল্লাহ ইবনে আতীক রা. বলেন, দুর্গের চাবি যে ছিদ্রপথে রাখা হয়েছিল তা আমি পূর্বেই দেখেছিলাম।

তাই রক্ষিত স্থান থেকে চাবিটি নিয়ে আমি দুর্গের দরজাটি খুললাম। তিনি বলেন, আমি মনে মনে ভাবলাম, কাওমের লোকেরা যদি আমাকে দেখে ফেলে তাহলে সহজেই আমি (পালিয়ে) যেতে পারব।

এরপর দুর্গের ভিতরে তাদের যত ঘর ছিল সবগুলো দরজা আমি বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলাম। এরপর সিঁড়ি বেয়ে আবু রাফির কক্ষে উঠলাম। বাতি নিভিয়ে দেয়া হয়েছিল বলে ঘরটি ছিল ভীষণ অন্ধকার। লোকটি কোথায়, কিছুতেই আমি বুঝতে পারছিলাম না। সুতরাং আমি তাকে ডাকলাম, হে আবু রাফি।

সে বলল, কে ডাকছ? তিনি বললেন, আওয়াজটি লক্ষ্য করে আমি একটু এগিয়ে গেলাম এবং তাকে আঘাত করলাম। সে চীৎকার করে উঠল। এ আঘাতে কোন কাজই হয়নি।

এরপর আবার আমি তার কাছে গেলাম, যেন আমি তাকে সাহায্য করব। আমি এবার স্বর পরিবর্তন করে বললাম, হে আবু রাফি তোমার কি হয়েছে?

সে বলল, কি আশ্চর্য ব্যাপার, তার মায়ের সর্বনাশ হোক, এইতো এক ব্যক্তি আমার ঘরে ঢুকে আমাকে তরবারী দ্বারা আঘাত করেছে, আবদুল্লাহ ইবনে আতীক বলেন, তাকে লক্ষ্য করে পুনরায় আমি আঘাত করলাম এবারও কোন কাজ হল না।

মাগাযী (যুদ্ধাভিযান) অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

সে চীৎকার করলে তার পরিবারের সবাই জেগে উঠল। তারপর পুনরায় আমি সাহায্যকারীর ভান করে কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন করে তার দিকে এগিয়ে গেলাম।

এ সময় সে পিঠের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে ছিল (এ দেখে) আমি তরবারীর অগ্রভাগ তার পেটের উপর রেখে এমন জোরে চাপ দিলাম যে, আমি তার হাড়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম। এরপর আমি কাঁপতে কাঁপতে সিঁড়ির নিকট এসে পৌঁছলাম। ইচ্ছা ছিল নেমে যাব।

কিন্তু (নামতে গিয়ে) আছাড় খেয়ে পড়ে গেলাম। এবং এতে আমার পা খানা ভেঙ্গে গেল। সাথে সাথে (পাগড়ী দিয়ে) আমি তা বেঁধে ফেললাম। এবং আস্তে আস্তে হেটে সাথীদের নিকট চলে এলাম।

এরপর বললাম, তোমরা যাও এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সুসংবাদ দাও। আমি তার মৃত্যুসংবাদ না শুনে আসব না। ঊষালগ্নে মৃত্যু ঘোষণাকারী (প্রাচীরে) উঠে বলল, আমি আবু রাফির মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করছি।

আবদুল্লাহ ইবনে আতীক রা. বলেন, এরপর আমি উঠে চলতে লাগলাম। এ সময় আমার (পায়ে) কোন ব্যথাই ছিল না।

আমার সাথীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পৌঁছার আগেই আমি তাদের ধরে ফেললাম এবং (গিয়ে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার (আবু রাফির) মৃত্যুর সংবাদ জানালাম।

আরও পড়ুনঃ

আম্বিয়া কিরাম (আ.) অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

আম্বিয়া কিরাম (আ.) অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

আম্বিয়া কিরাম (আ.) অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

সৃষ্টির সূচনা অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৫ম খণ্ড

সৃষ্টির সূচনা অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৫ম খণ্ড

মন্তব্য করুন