নাপাকি এবং নাপাকি থেকে পবিত্রতা অর্জনের উপায়

নাপাকি এবং নাপাকি থেকে পবিত্রতা অর্জনের উপায় [ ফিকহুস্ সুন্নাহ – ১ম খন্ড – সাইয়্যেদ সাবেক ] :

নাজাসা বা নাপাকি হলো সেই ময়লা বা নোংরামী, যা থেকে পবিত্র হওয়া প্রত্যেক মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক এবং যার কোনো অংশ তার গায়ে বা কাপড়ে লাগলে তা ধুয়ে পরিষ্কার করা অপরিহার্য। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন :

“তোমার কাপড় পবিত্র করো।” (সূরা ৭৪, আল-মুদদাসসির : আয়াত-৪)

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেছেন :

إن الله يحب التوابين ويحب المتطهرين

“নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।” (সূরা ২ আল-বাকারা, আয়াত : ২২২)

রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : “পবিত্রতা ঈমানের অংগ।” এ বিষেয় আরো অনেক আলোচনা রয়েছে যা নিম্নে উল্লেখ করছি :

নাপাকি এবং নাপাকি থেকে পবিত্রতা অর্জনের উপায় - Fiqh al-Sunnah
Fiqh al-Sunnah

নাপাকির প্রকারভেদ :

১. মৃত প্রাণী:

মৃত প্রাণী হলো সেগুলো, যেগুলো স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে, অর্থাৎ যবাই ব্যতিত। যে প্রাণীকে জীবিতাবস্থায় কেটে ফেলা হয় তাও এই শ্রেণীভুক্ত। আবু ওয়াকেদ লাইছী বলেছেন : রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “জীবিতাবস্থায় যে চতুষ্পদ জন্তুকে কেটে ফেলা হয় তা মৃত প্রাণী।” (আবু দাউদ ও তিরমিযি) তিরমিযি এটাকে ভালো হাদিস আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছেন : আলেমগণ এ হাদিস অনুসরণ করে থাকেন।

মৃত প্রাণীর আওতাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও নিম্নোক্তগুলো নাপাক নয় :

ক. মাছ ও পংগপালের মৃতদেহ :

এগুলো পাক। ইবনে উমর রা. বলেন, “রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: দুটো মৃত দেহ ও দুটো রক্ত আমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। মৃত দেহ দুটো হলো মাছ ও পংগপালের। আর রক্ত দুটো হলো যকৃত ও প্লিহা।” (আহমদ, শাফেয়ী, ইবনে মাজাহ, বায়হাকি ও দারু কুতনি কর্তৃক বর্ণিত।) হাদিসটি দুর্বল, তবে ইমাম আহমদের মতে এটি মওকুফ কিন্তু সহীহ। (যে হাদিসের সনদ সাহাবি পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। রসূল সা. পর্যন্ত পৌছেনি তাকে মওকুফ বলে)। আবু যারআ’ ও আবু হাতেমও এটাকে মওকুফ ও সহীহ বলেছেন।

এ ধরনের হাদিস মারফুর (যার সনদ রসূল সা. পর্যন্ত পৌঁছেছে) পর্যায়ভুক্ত। কোনো কোনো সাহাবি যখন বলেন “এটা আমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে ও এটা আমাদের উপর হারাম করা হয়েছে” তখন তা অবিকল “আমাদেরকে অমুক কাজ করতে আদেশ ও অমুক কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে” বলার সমপর্যায়ের।

ইতিপূর্বে রসূল সা. এর উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে সমুদ্র সম্পর্কে : “সমুদ্র পবিত্রকারী, তার পানি পবিত্র, তার ভেতরের মৃত প্রাণী হালাল।”

খ. প্রবহমান রক্তের অধিকারী নয় এমন প্রাণীর মৃত দেহ:

যেমন পিঁপড়ে ও মৌমাছি ইত্যদি। এগুলো পাক। এগুলো কোনো জিনিসের ভেতর পড়লে ও মারা গেলে সেই জিনিস নাপাক হয়না। ইবনুল মুনযির বলেছেন: এসব মৃত দেহ যে জিনিসে পড়ে তার পাক হওয়ার ব্যাপারে ইমাম শাফেয়ী ব্যতিত কেউ দ্বিমত প্রকাশ করেছে বলে আমার জানা নেই। তাঁর মাযহাবের সুপ্রসিদ্ধ মত হলো এটা নাপাক তবে কোনো তরল জিনিসে পড়লে যতোক্ষণ তা ঐ তরল জিনিসকে পরিবর্তিত না করবে ততোক্ষণ তা পাক থাকবে।

গ. প্রাণীর মৃত দেহের হাড়, শিং, নখ, চুল, পালক, চামড়া এবং এই জাতীয় জিনিস:

সব কিছুই পাক । এসব জিনিসের মূল অবস্থা হলো পবিত্রতা। নাপাক হওয়ার জন্য কোনো প্রমাণ নেই। হাতি প্রভৃতি জন্তুর মৃত দেহের হাড়গোড় সম্পর্কে বলেছেন: প্রাচীন আলেমদের অনেককে দেখেছি এর চিরুণী দ্বারা চুল আঁচড়াতে ও এর তেল ব্যবহার করতে। তারা এতে কোনো আপত্তির কিছু দেখেননি। বুখারি কর্তৃক বর্ণিত।

ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, “তিনি বলেছেন : মাইমুনার এক মুক্ত বাদীকে একটা ছাগল ছদকা করা হয়েছিল। পরে সেই ছাগল মারা গেলো। রসূল সা. তাদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন।

[ *** ৩. নাপাকি দু’রকমের : এক. যা ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা যায়। যেমন: পেশাব, পায়খানা, রক্ত। দুই. যা ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা যায়না । যেমন বীর্যপাতজনিত নাপাকি। ৪. এ দ্বারা শরিয়তসম্মত যবাই বুঝানো হয়েছে । *** ]

তিনি বললেন : তোমরা ছাগলটির চামড়া নিয়ে পাকিয়ে কাজে লাগালেনা কেনো? তারা বললো : ওটা তো মৃত ছিলো। রসুল সা. বললেন মৃত জন্তু তো শুধু খাওয়া হারাম।” (ইবনে মাজাহ ব্যতিত সব ক’টি হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত)

ইবনে মাজাহ এ হাদিস মাইমুনা থেকে বর্ণনা করেছেন। বুখারি ও নাসায়ীতে চামড়া পাকানোর উল্লেখ নেই। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত তিনি সূরা আল আনয়ামের ১৪৫নং আয়াত পাঠ করলেন এবং বললেন : এর যে জিনিস খাওয়া হয় সেটাই অর্থাৎ গোশত হারাম করা হয়েছে। চামড়া, চামড়া থেকে নির্গত বস্তু, দাঁত, হাত, চূল, পশাম – এসবই হালাল (ইবনুল মুনযির ও ইবনে আবি হাতেম কর্তৃক বর্ণিত) (সূরা ৬, আয়াত ১৪৩)

দুধ, মৃত ছাগল ছানার পেট থেকে বের হওয়া জমাট দুধ পবিত্র। সাহাবীগণ যখন ইরাক জয় করলেন তখন সেখানকার অগ্নি উপাসকদের তৈরি পনির খেয়েছিলেন। যা মৃত ছাগল শিশুর পেটের জমাট দুধ দিয়ে তৈরি হতো। অথবা তাদের যবাই করা জন্তুকে মৃতদেহ বিবেচনা করা হতো। সালমান ফারসী রা. থেকে বর্ণিত : তাকে পনির, ঘি ও পশুর লোমের তৈরি পোশাক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: আল্লাহ তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল আর যা তার কিতাবে হারাম করেছেন তা হারাম।

আর যেসব জিনিস সম্পর্কে মৌনতা অবলম্বন করেছেন সেসব ক্ষেত্রে তিনি অব্যাহতি দিয়েছেন। সালমান যখন মাদায়েনে উমর রা.-এর প্রতিনিধি ছিলেন তখন তাঁকে মূলত অগ্নি উপাসকদের পনির সম্পর্কেই জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল।

২. রক্ত:

চাই প্রবাহিত রক্ত হোক- যেমন যবাইকৃত জন্তু থেকে প্রবাহিত রক্ত। অথবা ঋতুবতীর রক্ত হোক। তবে এর খুব সামান্য পরিমাণকে অব্যাহতি দেয়া হয়। উপরোক্ত আয়াতে বর্ণিত “অথবা প্রবাহিত রক্ত” সম্পর্কে ইবনে জুরাইজ বলেছেন, এর অর্থ : যে রক্ত ঝরানো হয় । অবশ্য মৃত প্রাণীর রগের ভেতরে যে রক্ত রয়ে যায় তাতে কোনো আপত্তি নেই। ইবনুল মুনযির কর্তৃক বর্ণিত।

রক্ত সম্পর্কে আবু মিজলায় থেকে বর্ণিত আছে, তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, রক্ত ছাগলের যবাইয়ের জায়গায় থাকলে বা ডেগের উপরে দেখা দিলে কেমন হবে? তিনি বললেন : কোনো দোষ নেই। নিষিদ্ধ হয়েছে শুধু প্রবাহিত রক্ত। এটি আবদ বিন হোমায়েদ ও আবুশ শায়খ থেকে বর্ণিত। আয়েশা রা. বলেছেন : ডেগচির উপরিভাগে যখন রক্তের রেখা দৃষ্টিগোচর হতো এমতাবস্থায় আমরা গোশ্ত খেতাম। আর হাসান বলেছেন: মুসলমানরা তাদের যখম নিয়েই নামাজ পড়তো। -বুখারি ।

বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত আছে, উমর রা.-এর যখম থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে এমতাবস্থায় নামায পড়েছেন। হাফেয ইবনে হাজর ফতহুল বারীতে বলেছেন : আবু হুরায়রা রা. নামাযে দু’এক ফোটা রক্ত টপকালেও দূষণীয় মনে করতেননা। তবে কীট পতংগের রক্ত ও ফোড়া থেকে নির্গত রক্ত সাহাবিগণের এসব উক্তির আলোকে ক্ষমার যোগ্য। শরীরে ও কাপড়ে পুঁজ লাগা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে আবু মিজলায় বললেন: পুঁজ কোনো দূষণীয় জিনিস নয়। আল্লাহ রক্তের উল্লেখ করেছেন পুঁজের উল্লেখ করেননি।

ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: পুঁজ, রক্তমিশ্রিত পুঁজ ও রক্তবিহীন পুঁজ কাপড়ে লাগলে কাপড় ধোয়া জরুরি। তবে তিনি বলেছেন: এগুলোর নাপাক হওয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। যাহোক, এগুলো থেকে যথাসাধ্য দূরে থাকা উচিত।

৩. শুকরের গোশত :

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন :

قل لا أمن في ما أوحي إلى معرما على طاعر يطعية إلا أن يكون ميتة أو دما مسفوحا أو

أمر عنزير فانه رجس .

“বলো, আমার কাছে যে অহি এসেছে তাতে আমি কোনো আহারকারীর আহারের জন্য নিষিদ্ধ কিছু পাইনা কেবল মৃতদেহ, প্রবহমান রক্ত, অথবা শুকরের গোশত ব্যতিত। কেননা ওটা নাপাক।” (সূরা-৬, আল-আনয়াম : আয়াত-১৪৫)
অর্থাৎ উল্লিখিত তিনটি জিনিসই নোংরা যা সুস্থ মনের অধিকারীরা পছন্দ করেনা। আলেমদের প্রসিদ্ধ মত অনুসারে শুকরের পশম দিয়ে সেলাই এর কাজ করা জায়েয।

৪-৬. মানুষের বমি, পেশাব ও মল :

এ জিনিসগুলোর নাপাক হওয়া সর্বসম্মত। তবে স্বল্পপরিমাণ বমি মার্জনীয়। আর যে শিশু এখনো শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করেনি, তার পেশাবের উপর পানি ছিটিয়ে দেয়া যথেষ্ট। কারণ উম্মে কায়েস রা. বলেন : তিনি তার শক্ত খাবার খাওয়ার যোগ্য হয়নি এমন শিশুপুত্রকে নিয়ে রসূল সা. এর কাছে এলেন। তাঁর সেই শিশুপুত্র রসূল সা. এর কোলে পেশাব করে দিল। রসূল সা. পানি আনতে বললেন এবং তাঁর কাপড়ে একটু বেশি করে ছিটিয়ে দিলেন ধুলেননা।” -বুখারি, মুসলিম ।

আলী রা. বলেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ছেলে শিশুর পেশাবে পানি ছিটাতে হবে, আর মেয়ে শিশুর পেশাব ধুতে হবে। কাতাদা বলেন : যতোদিন তারা শক্ত খাবার না খায় ততোদিনের জন্য এই বিধি। যখন শক্ত খাবার ধরবে, তখন উভয়ের পেশাব ধুতে হবে। -আহমদ, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ। আলোচ্য হাদিসের ভাষা আহমদ থেকে উদ্ধৃত।

হাফেয ইবনে হাজর ফতহুল বারীতে বলেছেন : এ হাদিসের সনদ শুদ্ধ। আর পানি ছিটানো ততোদিনই যথেষ্ট হবে যতোদিন শিশু শুধু দুধ খায়। পুষ্টির জন্য যখন অন্য খাবার খাওয়া শুরু করে তখন সর্বসম্মতভাবে ধোয়া ওয়াজিব। শুধু পানি ছিটানোর অনুমতি দেয়ার কারণ সম্ভবত মানুষের শিশু সন্তানকে সাথে নিয়ে চলার প্রতি অত্যধিক আসক্তি। যার বলে কোলে প্রস্রাবের ঘটনা বেশি ঘটে এবং বারবার কাপড় ধোয়ায় বেশি কষ্ট হয়। তাই এই অনুমতি দ্বারা কষ্ট লাঘব করা হলো।

৭. ওদি:

ওদি এক ধরনের সাদা ঘন পানি, যা পেশাবের পর বের হয়। এটি সর্বমতভাবে নাপাক। আয়েশা রা. বলেছেন ওদি পেশাবের পরে বের হয়। যার এটা হবে সে তার জননেন্দ্রিয় ধুয়ে অযু করবে। গোসল করার প্রয়োজন নেই। ইবনুল মুনযির কর্তৃক বর্ণিত, ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন : মনি (বীর্য) বেরুলে গোসল করতে হবে। আর মযি ও ওদি বের হলে অযু করে পরিপূর্ণভাবে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে। আছরাম ও বায়হাকী কর্তৃক বর্ণিত। বায়হাকীর ভাষা হলো : ওদি ও মযি সম্পর্কে তিনি বলেছেন: তোমরা যৌনাঙ্গ ধুয়ে ফেল এবং নামাযের অযুর মতো অযু করো।

৮. মযি:

সাদা পিচ্ছিল পানি, যা সহবাসের চিন্তা করলে বা নরনারীর মেলামেশা ও আদর সোহাগের সময় নির্গত হয়। এটা নির্গত হওয়ার কথা মানুষ টের নাও পেতে পারে। নারী ও পুরুষ উভয়ের যৌনাঙ্গ থেকেই এটা নির্গত হয়ে থাকে। তবে নারীর যৌনাঙ্গ থেকেই অধিকতর। এটি সর্বসম্মতভাবে নাপাক। তবে এটা যখন শরীরে লাগবে তখন শরীর ধোয়া ওয়াজিব হবে। আর কাপড়ে লাগলে পানি ছিটিয়ে দেয়াই যথেষ্ট হবে। কেননা এটা এমন নাপাকি যা থেকে বেঁচে থাকা কষ্টকর। কারণ অবিবাহিত যুবক-যুবতীর কাপড়ে এটা খুব ঘন ঘনই লাগে। কাজেই ছেলে শিশুর পেশাবের চেয়ে এটির ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া অগ্রগণ্য।

“আলী রা. বলেছেন: আমার খুব বেশি মযি নির্গত হতো। একজনকে আদেশ দিলাম রসূল সা.কে এর কারণ জিজ্ঞাসা করতে। নিজে করিনি তাঁর মেয়ের বিদ্যমানতার কারণে। লোকটি জিজ্ঞাসা করলে রসূল সা. জবাব দিলেন : তোমার পুরুষাংগ ধৌত করো এবং অযু করো।” -বুখারি ও অন্যন্য গ্রন্থ।

সাহল বিন হানিফ রা. বলেছেন: “আমি মযির কারণে খুবই কষ্ট ভোগ করতাম আর এর জন্য আমি ঘন ঘন গোসল করতাম। বিষয়টা রসূল সা. এর নিকট ব্যক্ত করলাম। তিনি বললেন : তোমার তো অযু করাই যথেষ্ট। আমি বললাম: হে রসূলুল্লাহ! আমার কাপড়ে যে মযি লাগে, তার প্রতিকার কিভাবে করবো? বললেন: তোমার কাপড়ের যেখানে লেগেছে বলে মনে হয় সেখানে এক কোষ পানি ছিটায়ে দেয়াই যথেষ্ট হবে। আবু দাউদ ইবনে মাজাহ ও তিরমিযি কর্তৃক বর্ণিত। তিরমিযি এটাকে হাসান ও সহীহ বলেছেন।

আছরাম রা.ও এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষা এ রকম : “মযির কারণে আমি খুব কষ্টে ছিলাম, তাই রসূল সা. এর নিকট এলাম এবং তাঁকে বিষয়টি জানালাম। তিনি বললেন তুমি এক কোষ পানি নিয়ে তা ছিটায়ে দাও এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে।

৯. মনি (বীর্য) :

কোনো কোনো আলেম বীর্যকে নাপাক বলেছেন। তবে দৃশ্যত এটা পাক। কিন্তু ভিজে থাকা অবস্থায় একে ধুয়ে ফেলা এবং শুকনো অবস্থায় ঢলে বা খুটে তুলে ফেলা মুস্তাহাব। “আয়েশা রা. বলেছেন : আমি রসূল সা. এর কাপড় থেকে শুকনো বীর্য খুটে ফেলে দিতাম এবং ভিজা বীর্য ধুয়ে ফেলতাম।” -দারু কুতনি, বাযযার, আবু আওয়ানা।

ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন : “কাপড়ে লেগে থাকা বীর্য সম্পর্কে রসূল সা. কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি জবাবে বলেছেন : ওটা তো কফ ও থুথুর মতো। একটা নেকড়া বা ইযখির ঘাস দিয়ে মুছে ফেললেই যথেষ্ট হবে।” দার কুতনী, বায়হাকি ও তাহাবি হাদিসটি মারফু না মাওকুফ সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।

১০. যে সকল প্রাণীর গোশত খাওয়া না জায়েয সেগুলোর পেশাব ও গোবর :

এ দুটোই নাপাক । ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন: “রসূলুল্লাহ সা. পায়খানায় গেলেন। অতপর আমাকে আদেশ দিলেন যেনো তিন টুকরো পাথর তাঁকে দেই । আমি পেলাম দুটো পাথর, তৃতীয়টা খুঁজলাম, কিন্তু পেলামনা। একটা শুকনো গোবর পেলাম এবং সেটাই তাঁকে দিতে এলাম। তিনি পাথর দুটো নিলেন এবং গোবরটা ফেলে দিলেন। তিনি বললেন : এটা নাপাক।” -বুখারি ও ইবনে খুযায়মা।

কোনো কোনো রেওয়ায়েতে সংযোজিত হয়েছে : “এটা নাপাক। এতো গাধার গোবর।” এর সামান্য পরিমাণকে নাপাক হওয়া থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। কারণ থেকে পুরোপুরি বেঁচে থাকা কঠিন।

অলিদ বিন মুসলিম বলেছেন: আওযায়ী’কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম : যেসব চতুষ্পদ জন্তুর গোশত খাওয়া জায়েয নেই, যেমন খচ্চর, গাধা ও ঘোড়া, সেগুলোর পেশাবের কী হবে? তিনি জবাব দিলেন : মুসলমানগণ তাদের যুদ্ধবিগ্রহের সময় এগুলোর পেশাব দ্বারা আক্রান্ত হতো। কিন্তু তারা শরীর বা দেহ থেকে তা ধুতোনা। যেসকল জন্তুর গোশত হালাল, তার পেশাব ও পায়খানাকে ইমাম মালেক, আহমদ ও শাফেয়ী মাযহাবের একাংশ পবিত্র মনে করেন।

ইবনে তাইমিয়া বলেছেন : কোনো সাহাবিই একে নাপাক বলেননি, বরং একে নাপাক বলা একটা নতুন উদ্ভাবন যা সাহাবাদের কেউ বলেননি। আনাস রা. বলেছেন: “ইকল বা উরাইনা গোত্রের একদল লোক মদিনায় এসে দীর্ঘস্থায়ী পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হলো। রসূল সা. তাদেরকে দুগ্ধবতী উটনীর পেশাব ও দুধ খেতে আদেশ দিলেন।” -আহমদ, বুখারি, মুসলিম।

এ হাদিস উটের পেশাবের পবিত্রতার প্রমাণ বহন করে। উট ছাড়া অন্যান্য হালাল জন্তুকেও তদ্রূপ মনে করতে হবে। ইবনুল মুনযির বলেন : যারা দাবি করে এটা শুধু উরাইনা বা ইকলের জন্যই নির্দিষ্ট ছিলো, তারা ভুল বলেছেন। কেননা কোনো বিশিষ্টতা বিনা প্রমাণে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন: আলেমগণ কর্তৃক প্রাচীন ও সম্প্রতিককালে তাদের বাজারগুলোতে ছাগল ও ভেড়ার মল বিক্রি এবং ওষুধে উটের পেশার ব্যবহারে আপত্তি না করা দ্বারা প্রমাণিত হয়, এগুলো পাক। শওকানি বলেছেন : হালাল জন্তু মাত্রেরই মলমূত্র বাহাত পাক। কেননা এর মৌলিক অবস্থা হলো পবিত্রতা। নাপাক হওয়া শরিয়তে এমন একটা বিধি, যা তার মূল পবিত্রাবস্থা থেকে তাকে ভিন্ন অবস্থায় রূপান্তরিত করে।

কাজেই তাকে পরিবর্তন করার উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া পরিবর্তিত করার দাবিদারদের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। যারা একে নাপাক বলেন, তাদের কাছ থেকে এ বক্তব্যের সপক্ষে আমরা কোনো প্রমাণ পাইনি।

১১. মলখোর জন্তু:

মলখোর জন্তুর পিঠে আরোহণ, গোশত খাওয়া ও দুধ খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, “মলখোর প্রাণীর দুধ খেতে রসূল সা. নিষেধ করেছেন।” এটি ইবনে মাজাহ ব্যতিত অবশিষ্ট পাচঁটি সহীহ হাদিস গ্রন্থ কর্তৃক বর্ণিত। তিরমিযি একে সহীহ বলেছেন। অপর রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে : রসূল সা. মলখোর জন্তুর পিঠে চড়তেও নিষেধ করেছেন- আবু দাউদ। আমর বিন শুয়াইব বর্ণিত হাদিসে রসূল সা. গৃহপালিত গাধার গোশ্ত খেতে এবং মলখোর জন্তুর পিঠে আরোহণ ও গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।” -আহমদ, নাসায়ী ও আবু দাউদ।

মলখোর প্রাণী দ্বারা সাধারণত উট, গরু, ভেড়া, হাঁস ও মুরগী ইত্যাদির মধ্য থেকে যেগুলো বিষ্টা খায় এবং একারণে তাদের ঘ্রানে পরিবর্তন আসে, সেগুলোকে বুঝায়। কিছুকাল আটকে রেখে বিষ্টা খাওয়া বন্ধ রাখলে এবং পবিত্র জিনিস খাওয়ালে যদি গোশত পবিত্র হয়ে যায় এবং তাকে আর বিষ্টাখোর জন্তু বলে আখ্যায়িত না করা হয়, তাহলে হালাল হয়ে যাবে।

কারণ যে কারণে পরিবর্তন এসেছিল, সেটিই ছিলো নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ। সে কারণ যখন দূর হয়েছে, তখন আর নিষিদ্ধ রইলনা।

১২. মদ :

অধিকাংশ আলেমের মতে মদ নাপাক। কেননা আল্লাহ বলেছেন :

إنما الخمر والميسر والأنصاب والأزلام رجس من عمل الشيطي

“মদ, জুয়া প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর এসব নোংরা অপবিত্র, শয়তানের কাজ।” (সূরা ৫, মায়েদা আয়াত ৯০)

এক দল মদকে পাক বলে রায় দিয়েছেন। তাদের মতে ‘নোংরা’ শব্দটির অর্থ হলো নৈতিক দিক দিয়ে নোংরা নোংরা’ কথাটা মদকে লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে। অন্য যে কটি জিনিস আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো বাস্তবিকপক্ষে মোটেই নাপাক বিশেষণে ভূষিত হয়না। আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেছেন: “তোমরা নাপাক মূর্তিগুলো ত্যাগ করো।” স্পষ্টতই মূর্তি নৈতিকভাবে নাপাক। সেগুলো স্পর্শ করার কারণে কেউ নাপাক হয়না। আয়াতে যেভাবে এর ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, ওটা শয়তানের কাজ, মানুষের মধ্যে শত্রুতা ও ঘৃণার সৃষ্টি করে এবং নামায ও আল্লাহর স্মরণ থেকে বাধা দেয়। একথা দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, নোংরা অর্থ নৈতিক দিক দিয়ে নোংরা ও নাপাক। সুবুলুস সালাম গ্রন্থে বলা হয়েছে :

প্রকৃত ব্যাপার হলো, দ্রব্য ও বস্তুমাত্রই মূলত পবিত্র কোনো বস্তু হারাম হলেই তা নাপাক হওয়া অবধারিত হয়না। যেমন- গাজা হারাম, কিন্তু তা পবিত্র। নাপাক জিনিস মাত্রই অনিবার্যভাবে হারাম। কিন্তু হারাম জিনিস মাত্রই নাপাক নয়। কেননা কোনো জিনিসের নাপাক হওয়ার হুকুম বা বিধি হলো সর্বাবস্থায় তার স্পর্শ থেকে দূরে থাকা জরুরি। কাজেই কোনো বস্তুকে নাপাক বলে আখ্যায়িত করা তাকে হারাম ঘোষণা করারই নামান্তর। কিন্তু কোনো বস্তুকে হারাম ঘোষণা করলেই তাকে নাপাক ঘোষণা করা হয়না। পুরুষের জন্য স্বর্ণ ও রেশম পরা হারাম। অথচ এ দুটোই সর্বসম্মতভাবে পবিত্র।

সুতরাং মদকে হারাম ঘোষণাকারী আয়াত ও হাদিস দ্বারা তার নাপাক হওয়া প্রমাণিত হয়না। এজন্য অন্য কোনো প্রমাণ জরুরি। নচেত মূলত পবিত্র থাকার সর্বসম্মত নীতিমালার আলোকে তা পবিত্রই থাকবে। যে ব্যক্তি এর বিপরীত দাবি করবে তার দাবির সপক্ষে তাকে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।

১৩. কুকুর :

কুকুর নাপাক। কুকুর কোনো জিনিসকে জিভ দিয়ে চাটলে তা সাতবার ধোয়া ওয়াজিব। তন্মধ্যে প্রথমবার মাটি দিয়ে ধুতে হবে।

“রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমাদের কোনো পাত্র যদি কুকুর চাটে, তবে তাকে পাক করার জন্য সাতবার ধুতে হবে, তন্মধ্যে প্রথমবার মাটি দিয়ে।” -মুসলিম, আহমদ, আবু দাউদ ও বায়হাকি। প্রথমবার মাটি দিয়ে ধোয়ার অর্থ মাটির সাথে পানি মিশিয়ে ধুতে হবে। আর যে পাত্রে শক্ত খাবার রয়েছে তা চাটলে চাটা খাবার ও তার আশপাশের খাবার ফেলে দিতে হবে। বাকি অংশ আগের পবিত্রাবস্থায় বহাল থাকবে এবং তা ব্যবহার করা যাবে। তবে কুকুরের পশম পাক। কারণ এর নাপাক হওয়ার প্রমাণ নেই।

পবিত্রতা অর্জনের উপায় :

শরীর ও কাপড় পাক করার নিয়ম :

পবিত্রতা অর্জনের উপায় – শরীর ও কাপড়ে যদি নাপাকি লাগে এবং তা যদি দেখা যায়, যেমন- রক্ত, তবে তা দূর না হওয়া পর্যন্ত পানি দিয়ে ধোয়া ওয়াজিব। ধোয়ার পর যদি কিছু চিহ্ন অবশিষ্ট থাকে, যা দূর করা কঠিন হয়, তবে তা মার্জনীয়। আর যদি দেখা না যায়, যেমন পেশাব, তবে তা ধোয়াই যথেষ্ট হবে- এমনকি যদি একবারও ধোয়া হয় তবে তাতেই চলবে। আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেছেন : এক মহিলা রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট এসে বললো: “আমাদের একজনের কাপড়ে ঋতুর রক্ত লেগেছে, সে কী করবে? রসূল সা. বললেন:

সে আংগুল দিয়ে খুটে ও ঢলে পরিষ্কার করবে, অতপর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলবে। তারপর তা দিয়ে নামায পড়বে।” -বুখারি ও মুসলিম। আর যখন মহিলার কাপড়ের আঁচলে নাপাকি লাগে, তখন মাটিই তাকে পবিত্র করবে। কেননা হাদিসে আছে,

“এক মহিলা উম্মে সালামা রা.-কে বললো আমি আমার কাপড়ের আঁচল লম্বা রাখি এবং ময়লা জায়গা দিয়ে চলাফেরা করি। উম্মে সালামা রা. বললেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : কাপড়ে ময়লা লাগার পরে মাটি লাগলে তা-ই তাকে পাক করে দেবে।” -আহমদ, আবু দাউদ।

ভূমি পবিত্র করার পদ্ধতি :

পবিত্রতা অর্জনের উপায় – ভূমিতে নাপাকি লাগলে তার উপর পানি ঢেলে দিলে পাক হয়ে যাবে। কেননা আবু হুরায়রা রা. বলেছেন : “জনৈক বেদুঈন মসজিদে গিয়ে পেশাব করলো। লোকেরা তৎক্ষণাৎ তার উপর আক্রমণ করতে ছুটে গেলো। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: ওকে ছেড়ে দাও। ওর পেশাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। কেননা তোমাদেরকে তো সহজ করার জন্য পাঠানো হয়েছে, কঠিন করার জন্য পাঠানো হয়নি।” মুসলিম ব্যতিত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত।

ভূমি ও ভূমির সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত জিনিস যথা গাছ ও ভবনের ভিত শুকালেই পাক হয়ে যায়। আবু কুলাবা বলেছেন : ভূমির শুকানোই তার পবিত্র হওয়া। আয়েশা রা. বলেছেন : ‘ভূমির পবিত্রতা তার শুষ্কতা।’ ইবনে আবি শায়বা কর্তৃক বর্ণিত। এ হচ্ছে নাপাকি যখন তরল হয় তখনকার কথা। নাপাকি যখন শক্ত দেহধারী হয়, তখন তার অস্তিত্ব অপসারিত ও নিশ্চিহ্ন হওয়া ব্যতিত নাপাকি দূর হয়না।

ঘি ইত্যাদির পবিত্র করার উপায় :

পবিত্রতা অর্জনের উপায় – ইবনে আব্বাস কর্তৃক মাইমুনা রা. থেকে বর্ণিত। ঘির মধ্যে পতিত ইঁদুর সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা.-কে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি জবাব দিলেন: “ইঁদুরটি ও তার পাশের অংশ উঠিয়ে ফেলে দাও। তারপর তোমাদের ঘি খাও।” -বুখারি।

হাফেয বলেছেন : ইবনে আবদুল বার সর্বসম্মত মত উদ্ধৃত করে বলেছেন, জমাট পদার্থে যখন কোনো মৃত প্রাণী পড়ে, তখন তা ও তার আশপাশের জিনিস ফেলে দিতে হবে। যদি নিশ্চিত হওয়া যায়, উক্ত মৃত প্রাণীর কোনো অংশ ঐ স্থানের বাইরে যায়নি। অবশ্য তরল পদার্থ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ আলেমের মতে নাপাকি মিশ্রিত হওয়ার দরুন পুরো জিনিসটাই নাপাক হয়ে যায়। তবে যুহরি ও আওযায়ীসহ একটি দল এর বিপরীত মত পোষণ করেন। ৫

মৃত জন্তুর চামড়া পবিত্র করার উপায় :

পবিত্রতা অর্জনের উপায় – মরা প্রাণীর চামড়া বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় দিক দিয়েই পবিত্র হয় দাবাগত অর্থাৎ পাকানো বা পরিশোধনের মাধ্যমে। কারণ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণিত হাদিসে রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন “চামড়া যখন পাকানো হয় তখন তা পবিত্র হয়।”- বুখারি ও মুসলিম।

আয়না ইত্যাদির পবিত্রকরণ :
আয়না, ছুরি-চাকু, তলোয়ার, নখ, হাড়, কাঁচ, তৈলাক্ত পাত্র এবং শান দেয়ার এমন ধাতব উপকরণ, যাতে কোনো অতিক্রমণের সূক্ষ্ম পথ নেই- এসব জিনিস থেকে নাপাকি মুছে ফেললেই তা পাক হয়ে যায়। সাহাবিগণ তাদের রক্তমাখা তরবারি বহন করে নামায পড়তেন। তারা রক্ত মুছে ফেলতেন এবং তাকেই যথেষ্ট মনে করতেন।

[ *** ৫. এই দু’জনের মতে তরল পদার্থের বিধি পানির বিধির মতো নাপাকির মিশ্রণে তার মধ্যে পরিবর্তন ঘটা ব্যতিত তা নাপাক হয়না। পরিবর্তিত নাহলে পাক থাকবে। এ মত ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস ও বুখারির এবং এটাই সঠিক। ***]

জুতা পবিত্রকরণ :

পবিত্রতা অর্জনের উপায় – নাপাকিযুক্ত জুতা ও মোজা ভূমির সাথে ঢলে মুছে ফেলার পর নাপাকির চিহ্ন দূর হলেই পাক হয়ে যায় । কারণ আবু হুরায়রা রা. বলেন, রসূল (স.) বলেছেন: তোমাদের কেউ যখন তার জুতা দিয়ে কোনো নাপাকি জিনিস মাড়ায়, তখন মাটি তাকে পবিত্র করে। -আবু দাউদ। অন্য বর্ণনায় রয়েছে : যখন কেউ তার মোজা দিয়ে নাপাক জিনিস মাড়ায়, তখন মাটি দিয়ে সেই মোজা পবিত্র করা যায়। আর আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন:

তোমাদের কেউ যখন মসজিদে আসে, তখন সে যেনো তার জুতো উল্টিয়ে দেখে নেয়। তাতে যদি কোনো নাপাকি দেখতে পায়, তবে তা যেনো ভূমির সাথে রগড়িয়ে মুছে ফেলে। তারপর তা নিয়ে নামায পড়ে। আহমদ, আবু দাউদ।

মাটি দিয়ে মুছে ফেলা জুতো পবিত্র হওয়ার আর একটি কারণ এই যে, এটা এমন একটা জায়গা, যার সাথে বারবার প্রায় নাপাকি লেগে থাকে। তাই তাকে জমাট পদার্থ দিয়ে মোছাই যথেষ্ট। যেমন- পেশাব, পায়খানা কুলুখ দিয়ে মুছে ফেলার জায়গাটি। অর্থাৎ মলমূত্র ত্যাগের স্থান। এখান দিয়ে মাত্র দু’বার বা তিনবার নাপাকি নির্গত হয় ও নাপাকি লাগে। অথচ সেটা কুলুখ দিয়ে মোছাতেই পাক হয়ে যায়। জুতোয় তো তার চেয়েও বেশিবার নাপাকি লাগে । সুতরাং জুতো পাক হওয়া আরো বেশি যুক্তি সংগত।

কয়েকটি প্রয়োজনীয় তথ্য :

১. যে রশিতে ধোয়া কাপড় নাড়া হয়, তাতে নাপাক কাপড়ও নাড়া হয়। তারপর রোদে বা বাতাসে ঐ রশি শুকিয়ে যায়। তারপর ঐ রশিতে পাক কাপড় নাড়লে ক্ষতি নেই।

২. কোনো ব্যক্তির উপর কোনো তরল পদার্থ পড়লো। কিন্তু ওটা পানি না পেশাব তা সে জানেনা। এমতাবস্থায় তার জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন নেই। আর জিজ্ঞাসা করলে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তির জবাব দেয়া জরুরি নয়, যদিও সে জানে ওটা নাপাক পদার্থ। এমতাবস্থায় তার ওটা ধোয়ার দরকার নেই।

৩. রাতের বেলা কারো পায়ে বা কাপড়ে কোনো ভিজে জিনিস লাগলো। সে জানেনা জিনিসটা কী? এমতাবস্থায় ঘ্রাণ শুকে জিনিসাটর পরিচয় লাভ করা নিষ্প্রয়োজন। কারণ বর্ণিত আছে, একদিন উমর রা. কোথাও যাচ্ছিলেন। সহসা তার গায়ে ছাদের পাইপ থেকে কি যেনো পড়লো। উমর রা.-এর সাথে একজন সংগি ছিলো। সে জিজ্ঞাসা করলো ওহে পাইপওয়ালা! আপনার পানি পাক না নাপাক? উমর রা. বললেন: হে পাইপওয়ালা! আপনি আমাদেরকে এটা জানাবেননা? তারপর তিনি চলে গেলেন।

৪. রাস্তার কাদা লাগলে তা ধোয়া জরুরি নয়। কামাইল বিন যিয়াদ বলেছেন: আমি আলী রা.-কে দেখেছি, বৃষ্টির কাদা পাড়িয়ে মসজিদে ঢুকলেন এবং পা না ধুয়েই নামায পড়লেন।

৫. কোনো লোক নামায শেষ করে চলে যাওয়ার পর তার দেহে বা কাপড়ে নাপাক জিনিস দেখলে, যা তার অজ্ঞাতসারেই লেগেছিল অথবা সে জানতো, কিন্তু ভুলে গিয়েছিল, অথবা ভুলে যায়নি কিন্তু তা দূর করতে অক্ষম ছিলো, তার নামায শুদ্ধ হবে। দ্বিতীয়বার পড়তে হবেনা। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “তোমরা যে ভুল করে ফেলেছ, তাতে তোমাদের কোনো ক্ষতি নেই।” (সূরা ৩৩, আহযাব : আয়াত-৫)
সাহাবি ও তাবেয়ীদের অনেকেই এই রায় মোতাবেক ফতোয়া দিয়েছেন ।

৬. কাপড়ের ঠিক কোন্ জায়গায় নাপাকি লেগেছিল তা অজ্ঞাত থাকলে পুরো কাপড় ধোয়া ওয়াজিব। কারণ পুরোটা ধোয়া ছাড়া পবিত্রতার ব্যাপারে নিশ্চিত হবার আর কোনো উপায় নেই। কাজেই এটা “যে কাজ না করলে ওয়াজিব আদায় হয়না সে কাজ ওয়াজিব” এই মূলনীতির আওতাভুক্ত।

৭. কয়েকটি কাপড় এক সাথে রয়েছে। তন্মধ্যে একটি নাপাক। কিন্তু কোন্‌টি তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এমতাবস্থায় কেবলা অজানা থাকলে যেমন কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনা করে যে দিক সম্বন্ধে ধারণা প্রবলতর হয় সেটি স্থির করতে হয়। এখানেও তেমনি করতে হবে। এরূপ ক্ষেত্রে একটি কাপড়ে মাত্র একবার নামায পড়া যাবে। চাই কাপড়ের সংখ্যা বেশি হোক বা কম হোক৷

মলমূত্র ত্যাগের বিধি :

মলমূত্র ত্যাগের জন্য কিছু নিয়ম কানুন বা বিধিমালা রয়েছে যা সংক্ষেপে নিম্নরূপ :

১. আল্লাহর নাম লিখিত আছে এমন কোনো জিনিস মলমূত্র ত্যাগকারী সাথে নিয়ে যাবেনা। অবশ্য হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকলে অথবা সংরক্ষিত জিনিস হিসেবে সাথে থাকলে ভিন্ন কথা। কেননা আনাস রা. বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সা. একটি আংটি পরতেন, যাতে ‘মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ’ কথাটি খোদিত ছিলো। তিনি যখনই পায়খানায় যেতেন, সেটি খুলে রেখে যেতেন। -চারটি সহীহ হাদিস গ্রন্থ কর্তৃক বর্ণিত।

হাফেয এ হাদিসেকে দুর্বল এবং আবু দাউদ অগ্রহণযোগ্য আখ্যায়িত করেছেন। হাদিসের প্রথম অংশ সহীহ।

২. জনসাধারণের সান্নিধ্য থেকে দূরে বা আড়ালে বা পায়খানায় যাওয়া উচিত, বিশেষত মলত্যাগের বেলায়, যাতে কোনো শব্দ না শোনা যায় ও গন্ধ না পাওয়া যায়। কারণ জাবির রা বলেছেন : “আমরা এক সফরে রসূল সা. এর সাথে বের হলাম। সফরে তিনি যখনই মলত্যাগ করতে যেতেন, অদৃশ্য হয়ে যেতেন এবং তাকে দেখা যেতনা। ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ। আবু দাউদের ভাষা এরকম : “যখন তিনি মলত্যাগ করতে চাইতেন, এমন জায়গায় চলে যেতেন যে, কেউ তাঁকে দেখতোনা এবং অনেক দূরে চলে যেতেন।”

৩. মলমূত্র ত্যাগের ঘরে প্রবেশের সময় ও কাপড় উপরে তোলার সময় সশব্দে আউযু বিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়বে। কারণ আনাস রা. বলেছেন : “রসূল সা. যখনই পায়খানা বা পেশাবখানায় যেতেন তখন বলতেন: “হে আল্লাহ! আমি নোংরা পুরুষ ও নোংরা স্ত্রীদের থেকে তোমার আশ্রয় চাই : (অর্থাৎ পুরুষ শয়তান ও নারী শয়তান থেকে)। -সব কয়টি সহীহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত।

৪. পূর্ণ নিরবতা অবলম্বন করবে। এমনকি যিকির, সালাম ও আযানের জবাব দেয়া থেকেও বিরত থাকবে। তবে একান্ত জরুরি কথা বলা যাবে। যেমন- কোনো অন্ধ ব্যক্তি, যাকে পথের সন্ধান না দিলে তার প্রাণহানি ঘটার আশংকা রয়েছে, তার সাথে প্রয়োজনীয় কথা বলা যাবে। এ সময় হাঁচি হলে মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ বলবে। এর জন্য জিহবা নাড়াবেনা। কেননা ইবনে উমর রা. বর্ণিত হাদিসে আছে : “রসূলুল্লাহ সা. পেশাব করছিলেন এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি তাঁর কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। সে রসূল সা.-কে সালাম করলো, কিন্তু তিনি জবাব দিলেন না। -বুখারি ব্যতিত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।

আর আবু সাঈদ খুদরি রা. বলেন: “আমি রসূলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি, দু’জন লোক যখন সতর খুলতে খুলতে ও পরস্পর কথা বলতে বলতে পেশারখানায় বা পায়খানায় যায় তখন আল্লাহ অসন্তুষ্টি হন। আহমদ, আবু দাউদ, ইবেন মাজাহ।

এ হাদিস দৃশ্যত কথা বলাকে নিষিদ্ধ সাব্যস্ত করে। তবে ইজমা (সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত) হলো এ সময় কথা বলা মাকরূহ।

৫. কেবলার মর্যাদা সুন্নত রাখবে। কেবলাকে সামনেও রাখবেনা পেছনেও রাখবেনা। কেননা আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদিসে রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : “তোমাদের কেউ যখন তার প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করতে বসবে, তখন কেবলাকে সামনেও রাখবেনা, পেছনেও রাখবেনা”। আহমদ ও মুসলিম। এ হাদিস দ্বারা কাজটি মাকরূহ বুঝানো হয়েছে। কেননা ইবনে উমর রা. বলেন: “আমি একদিন হাফসা রা.-এর বাড়ির ছাদে উঠলাম। সেখান থেকে দেখলাম রসূল সা. প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করছেন সিরিয়ার দিকে মুখ করে কাবা শরিফকে পেছনে রেখে।” সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত।

উভয় হাদিসের মধ্যে সমন্বয় রক্ষার জন্য বলা যেতে পারে, খোলা মাঠে কেবলাকে সামনে বা পেছনে রেখে মলমূত্র ত্যাগ করা নিষেধ। আর বাড়ি ঘরে জাযেয়। বস্তুত এই মতটি পূর্ববর্তী মত অর্থাৎ মাকরূহ সাব্যস্ত করার চেয়ে ভালো)। মারওয়ান আল আসগর রা. বলেন: “ইবনে উমর রা.-কে দেখেছি, নিজের বাহক জন্তুকে থামিয়ে কেবলার দিকে পেশাব করলেন। আমি বললাম :

হে আবু আবদুর রহমান। এ কাজটি কি নিষিদ্ধ করা হয়নি? তিনি বললেন হাঁ, এটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে খোলা ময়দানে। তবে যেখানে তোমার ও কেবলার মাঝে এমন কোনো জিনিস থাকবে, যা তোমাকে আড়াল করে, সেখানে কেবলার দিকে মুখ করে বা কেবলাকে পেছনে রেখে মলমূত্র ত্যাগে দোষের কিছু নেই। -আবু দাউদ, ইবনে খুযায়মা, হাকেম।

৬. এমন জায়গা খুঁজে নিতে হবে যা নরম ও নিচু। যাতে নাপাকির ছিটা নিজের শরীর ও কাপড়ে আসা থেকে নিরাপদ থাকা যায়। কারণ আবু মূসা রা. বলেন : “রসূলুল্লাহ সা. একটা দেয়ালের পাশের একটা সমতল জায়গায় এলেন ও পেশাব করেলেন এবং বললেন তোমাদের কেউ যখন পেশাব করে, তখন সে যেনো পেশাব করার জন্য উপযুক্ত) স্থান অনুসন্ধান করে।” -আহমদ, আবু দাউদ।

হাদিসটিতে একজন অচেনা বর্ণনাকারী থাকলেও এর বক্তব্য সঠিক।

৭. গর্তের ভেতরে পেশাব পায়খানা করা থেকে বিরত থাকবে, যাতে গর্তের কোনো প্রাণী তাকে দংশন না করে। কাতাদা বর্ণিত হাদিসে আছে, তিনি বলেন: “রসূলুল্লাহ সা. গর্তে পেশাব করতে নিষেধ করেছেন। লোকেরা কাতাদাকে বললো : গর্তে পেশাব করা কি কারণে অপছন্দ করা হয়? তিনি বললেন কেননা গর্তগুলো জিনদের বাসস্থান। আহমদ, নাসায়ী, আবু দাউদ, হাকেম, বায়হাকি, ইবনে খুযায়মা, ইবনুস সাকান।

৮. যেসকল গাছের ছায়ায় মানুষ বিশ্রাম নেয়, যেসব পথ দিয়ে মানুষ চলাফেরা করে ও কথাবার্তা বলে, সেখানে পেশাব পায়খানা করবেনা। কেননা আবু হুরায়রা রা. বলেন: রসূল সা. বলেছেন : “তোমরা অভিশাপদানকারীদের থেকে বেঁচে থাকো (অর্থাৎ অভিশাপের কারণসমূহ থেকে)। লোকেরা জিজ্ঞাসা করলো : অভিশাপকারী কী হে রসূলুল্লাহ! রসূল সা. বললেন মানুষের চলাফেরার রাস্তায় ও গাছের ছায়ার নিচে পেশাব পায়খানা করা।” আহমদ, মুসলিম ও আবু দাউদ।

৯. গোসলখানায় প্রবহমান বা অপ্রবহমান পানিতে পেশাব করবেনা। আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল রা. বলেন, রসূল সা. বলেছেন: “তোমাদের কেউ যেনো নিজের গোসলখানায় পেশাব না করে। অতপর সেখানেই অযু না করে। কেননা প্রধানত এ কারণেই শয়তানের কু-প্ররোচণা সৃষ্টি হয়। পাঁচটি সহীহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত। তবে “সেখানেই অযু না করে”। কথাটা শুধু আহমদ ও আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে ।

জাবির রা. থেকে বণিত : রসূলুল্লাহ সা. স্থির পানিতে পেশাব করতে নিষেধ করেছেন।” আহমদ, মুসলিম, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ। জাবির রা. থেকে আরো বর্ণিত : রসূলুল্লাহ সা. প্রবহমান পানিতে পেশাব করতে নিষেধ করেছেন। -মাজমাউয্ যাওয়ায়েদে বলা হয়েছে, এটি তাবারানি বর্ণনা করেছে এবং এর সকল বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত। তবে গোসলখানায় যদি পানি সরানোর নল বা নর্দমা থাকে তাহলে তাতে পেশাব করা দূষণীয় নয়।

১০. দাঁড়িয়ে পেশাব করবেনা। কেননা এটা সম্মান, গাম্ভীর্য ও উত্তম চরিত্রের বিপরীত । তাছাড়া এতে গায়ে ছিটে আসার আশংকা থাকে। ছিটে আসার আশংকা না থাকলে জায়েয আছে।

আয়েশা রা. বলেছেন, “যে ব্যক্তি তোমাদেরকে বলবে- রসূল সা. দাঁড়িয়ে পেশাব করেছেন তার কথা বিশ্বাস করোনা। তিনি বসে ছাড়া পেশাব করতেননা।” -আবু দাউদ ব্যতিত পাঁচটি হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত।

তিরমিযির মতে, এটি এ বিষয়ে সবচেয়ে সুন্দর ও বিশুদ্ধ হাদিস। তবে আয়েশার রা. হাদিসটির ভিত্তি হলো তিনি যা জানতেন তাই। তাই হুযায়ফা থেকে বর্ণিত হাদিস তার বিরোধী নয়। তিনি বর্ণনা করেছেন যে, “রসূলুল্লাহ সা. একটি গোত্রের বর্জ্য নিক্ষেপের জায়গায় গিয়ে থামলেন এবং দাঁড়িয়ে পেশাব করলেন। আমি সরে গেলাম। পরে তিনি আমাকে বললেন : কাছে এসো। আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। তখন তিনি অযু করলেন ও তার মোজায় মসেহ করলেন।” -সব কটি সহীহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত।

ইমাম নববী বলেছেন : বসে পেশাব করা আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়। দাঁড়িয়ে পেশাব করাও জায়েয। সবটাই রসূল সা. থেকে প্রমাণিত।

১১. মল ও মূত্র নির্গমনের স্থান থেকে নাপাকি দূর করতে হবে। একাজটি পাথর দ্বারা কিংবা অনুরূপ এমন কোনো শক্ত পবিত্র জিনিস দ্বারা করবে, যা নাপাকি দূর করতে সক্ষম এবং যা কোনো সম্মানাহ্ বা পবিত্র বস্তু নয়, অথবা শুধু পানি দিয়েই ধুয়ে ফেলবে, অথবা দুটোই ব্যবহার করবে। কেননা আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমাদের কেউ যখন পায়খানায় যাবে, তখন তিনটে পাথর দিয়ে শরীর থেকে নাপাকি দূর করবে। এটাই তার জন্য যথেষ্ট । -আহমদ, নাসায়ী, আবু দাউদ, দার কুতনি।

আনাস রা. বলেন : রসূলুল্লাহ সা. যখন পায়খানায় যেতেন তখন আমি ও আমার মতো একটা ছেলে এক বদনা পানি ও একটা লাঠি তার সাথে নিয়ে যেতাম। অতপর তিনি সেই পানি দিয়ে পবিত্র হতেন। -বুখারি ও মুসলিম।

ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ সা. দুটো কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন : এরা দু’জন আযাব ভোগ করছে। তবে তেমন বড় কোনো কারণে আযাব ভোগ করছেনা। (অর্থাৎ যে কাজের জন্য আযাব ভোগ করছে তা ত্যাগ করা তাদের জন্য কঠিন কিছু ছিলনা।) তাদের একজন পেশাব থেকে পবিত্রতা অর্জন করতোনা এবং তা থেকে বেঁচে থাকতোনা । আর অপর জন চোগলখুরি করে বেড়াতো।” -সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: পেশাব থেকে বেঁচে থাকো। কেননা কবরের আযাব প্রধানত তা থেকেই হয়ে থাকে।

১২. ডান হাত দিয়ে ইসতিনজা (মলমূত্র থেকে পবিত্রতা অর্জন) করবেনা। আব্দুর রহমান বিন যায়েদের বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, সালমানকে বলা হলো : আপনাদের নবী তো আপনাদের সবকিছু শিক্ষা দিয়েছেন, এমনকি মলমূত্র সম্পর্কেও। সালমান বললেন, অবশ্যি। … আমাদেরকে তিনি কেবলার দিকে মুখ পেশাব বা পায়খানা করতে, ডান দিয়ে তিনটের পাথর (কুলুফ) দ্বারা ইসতিনজা করতে এবং কোনো জিনিস দ্বারা বা হাঁড় ইসতিনজা করতে নিষেধ করেছেন। -মুসলিম, আবু তিরমিযি।

রা. বর্ণিত : রসূল সা. পানাহার করা, কাপড় পরা, নেয়া দেয়ার জন্য ডান হাত এগুলো অন্য মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম ও বায়হাকি

১৩. ইসতিনজার পর পুনরায় হাত মাটি দিয়ে মুছে অথবা সাবান ইত্যাদি দিয়ে ধুয়ে ফেলবে হাতে লেগে থাকা দূর হয়। কারণ আবু পেশাবখানা পায়খানায় যেতেন তখন আমি তাঁর কাছে একটা পাত্রে বা চামড়ার করে পানি নিয়ে যেতাম, তারপর সেই পানি দিয়ে তিনি ইসতিনজা করতেন, অতপর মাটি দিয়ে মুছতেন।” -আবু দাউদ, নাসায়ী, বায়হাকি, ইবনে মাজাহ।

১৪. পেশাব করার পর গুপ্তাংগে পরনের কাপড়ে পানি ছিটিয়ে দেবে। এতে ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কু-প্ররোচনা) হয়। পরে যখন দেখবে, মনে মনে বলবে, ছিটানোর ভিজা। হাকাম বিন সুফিয়ান অথবা সুফিয়ান বিন হাকাম বলেছেন: “যখন রসূল করতেন, তখন করতেন এবং পানি ছিটাতেন।” অপর বর্ণনায় রয়েছে রসূল দেখেছি, পেশাব করেছেন, তারপর নিজের গুপ্তাংগের উপর ছিটিয়েছেন। আর উমর তার গুপ্তাংগের উপর এতো পানি ছিটাতেন তার পায়জামা ভিজে যেতো

১৫. পেশাবখানা বা পায়খানায় প্রবেশের সময় আগে বাড়িয়ে দেবে। বের হবার আগে ডান পা বের আর বলবে “গুফরানাকা।” আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত রসূল যখন পেশাবখানা পায়খানা বের হতেন, বলতেন: “গুফরানাকা।” অর্থাৎ হে আল্লাহ! তোমার নিকট ক্ষমা চাই। -নাসায়ী ব্যতিত সহীহ গ্রন্থ। আয়েশা রা.-এর উক্ত হাদিসই বিষয়ে বর্ণিত সর্বাপেক্ষা সহীহ হাদিস। দুর্বল সনদে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, রসূল সা. বলতেন:

“আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা যিনি আমার নিকট কষ্ট অপবিত্রতা দূর করেছেন এবং দিয়েছেন।” অথবা “আল্লাহর করিয়েছেন, আমার মধ্যে তাঁর শক্তি বহাল রেখেছেন এবং আমার কাছ থেকে কষ্ট ও জিনিস দূর করেছেন।”

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন