নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায়

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

Table of Contents

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩২৯৭

হাদীস নং ৩২৯৭

আহমদ ইবনে সাঈদ রহ…………বারা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা মুবারক ছিল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর এবং তিনি ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তিনি অতিরিক্ত লম্বাও ছিলেন না এবং বেমানান বেঁটেও ছিলেন না।

বুখারি হাদিস নং ৩২৯৮

হাদীস নং ৩২৯৮

আবু নুআইম রহ……….কাতাদা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস রা.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুলে খেযাব ব্যবহার করেছেন কি ? তিনি বললেন, না (তিনি তা ব্যবহার করেননি)। তাঁর কানের পাশে গুটি কয়েক চুল সাদা হয়েছিল মাত্র। (কাজেই চুলে খেযাব ব্যবহারের আবশ্যক হয় নাই)।

বুখারি হাদিস নং ৩২৯৯

হাদীস নং ৩২৯৯

হাফস ইবনে উমর রহ……….বারা ইবনে আযিব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঝারি গড়নের ছিলেন। তাঁর উভয় কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান প্রশস্ত ছিল।

তাঁর মাথার চুল দুই কানের লতি পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। আমি তাকে লাল ডোরাকাটা জোড় চাদর পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। তাঁর চেয়ে অধিক সুন্দর কাউকে আমি কখনো দেখিনি।

ইউসুফ ইবনে আবু ইসহাক তাঁর পিতা থেকে হাদীস বর্ণনায় বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথার চুল কাঁধ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল।

বুখারি হাদিস নং ৩৩০০

হাদীস নং ৩৩০০

আবু নুআইম রহ…………আবু ইসহাক তাবেই রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বারা রা.-কে জিজ্ঞাসা করা হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা মুবারক কি তরবারীর ন্যায় (চকচকে) ছিল ? তিনি বলেন না, বরং চাঁদের মত (স্নিগ্ধ ও মনোরম) ছিল।

বুখারি হাদিস নং ৩৩০১

হাদীস নং ৩৩০১

হাসান ইবনে মানসুর আবু আলী রহ……….হাকাম রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু জুহায়ফা রা.-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুপুর বেলায় বাতহার দিকে বেরিয়ে গেলেন। সে স্থানে অজু করে যুহরের দু’রাকআত ও আসরের দু’রাকআত সালাত আদায় করেন।

তাঁর সম্মুখে একটি বর্শা পোতা ছিল। বর্শার বাহির দিক দিয়ে নারীগণ যাতায়াত করছিল। সালাত শেষে লোকজন দাঁড়িয়ে গেল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উভয় হাত ধরে তারা নিজেদের মাথা ও চেহারায় বুলাতে লাগলেন।

আমিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাত মুবারক ধারণ করতঃ আমার চেহারায় বুলাতে লাগলাম। তাঁর হাত তুষার চেয়ে স্নিগ্ধ শীতল ও কস্তুরীর চেয়ে অধিক সুগন্ধ ছিল।

বুখারি হাদিস নং ৩৩০২

হাদীস নং ৩৩০২

আবদান রহ………..ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাপেক্ষা অধিক দানশীল ছিলেন। তাঁর বদান্যতা বহুগুণ বেড়ে যেত রমযান মোবারকের পবিত্র দিনে যখন জিবরাঈল আ. তাঁর সাক্ষাতে আসতেন।

জিবরাঈল আ. রমযানের প্রতিরাতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করে কুরআনে করীমের দাওর করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কল্যাণ বিতরণে প্রবাহিত বায়ূ অপেক্ষাও অধিক দানশীল ছিলেন।

বুখারি হাদিস নং ৩৩০৩

হাদীস নং ৩৩০৩

ইয়াহইয়া ইবনে মূসা রহ……….আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত যে, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত আনন্দিত ও প্রফুল্লচিত্তে তাঁর কাছে প্রবেশ করলেন। খুশীর আমেজে তাঁর চেহারার খুশীর চিহ্ন ঝলমল করছিল।

তিনি তখন আয়েশাকে বললেন, হে আয়েশা ! তুমি শুননি, মুদলাজী ব্যক্তিটি (চেহারার ও আকৃতি গণনায় পারদর্শী) যায়েদ ও উসামা সম্পর্কে কি বলেছে?

পিতা পুত্রের শুধু পা দেখে (শরীরের বাকী অংশ ঢাকা ছিল) বলল, এ পাগুলো একটা অন্যটির অংশ (অর্থাৎ তাদের সম্পর্ক পিতা-পুত্রের)।

বুখারি হাদিস নং ৩৩০৪

হাদীস নং ৩৩০৪

ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর রহ………….আবদুল্লাহ ইবনে কাব রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার পিতা কাব ইবনে মালিক রা.-কে তার তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি।

তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সালাম করলাম, খুশী ও আনন্দে তাঁর চেহারা মুবারক ঝলমল করে উঠল।

তাঁর চেহারা এমনি-ই খুশী ও আনন্দে ঝলমল করত। মনে হত যেন চাঁদের একটি টুকরা। তাঁর চেহারা মুবারকের এ অবস্থা থেকে আমরা তা বুঝতে সক্ষম হতাম।

বুখারি হাদিস নং ৩৩০৫

হাদীস নং ৩৩০৫

কাতাইবা ইবনে সাঈদ রহ……….আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি মানব জাতির সর্বোত্তম যুগে আবির্ভূত হয়েছি। যুগের পর যুগ হয়ে আমি সেই যুগেই জন্মেছি যে যুগ আমার জন্য নির্ধারিত ছিল।

বুখারি হাদিস নং ৩৩০৬

হাদীস নং ৩৩০৬

ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর রহ……….ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চুল পিছনের দিকে আঁচড়িয়ে রাখতেন আর মুশরিকগণ তাদের চুল দু’ভাগ করে সিঁতি কেটে রাখত। আহলে কিতাব তাদের চুল পিছনের দিকে আঁচড়িয়ে রাখত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কোন বিষয়ে আল্লাহর আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত আহলে কিতাবের অনুকরণকে ভালবাসতেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চুল দু’ভাগ করে সিঁথি কেটে রাখতে রাখতে লাগলেন।

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৩০৭

হাদীস নং ৩৩০৭

আবদান রহ………..আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অশ্লীল ভাষী ও অসদাচারী ছিলেন না। তিনি বলতেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বশ্রেষ্ঠ যে নৈতিকতায় সর্বোত্তম।

বুখারি হাদিস নং ৩৩০৮

হাদীস নং ৩৩০৮

আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ রহ………..আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে (জাগতিক বিষয়ে) যখনই দুটি জিনিসের একটি গ্রহণের ইখতিয়ার দেওয়া হত, তখন তিনি সহজ সরলটিই গ্রহণ করতেন যদি তা গুনাহ না হত। যদি গুনাহ হত তবে তা থেকে তিনি অনেক দূরে সরে থাকতেন ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তিগত কারণে কারো থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নি। তবে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘন করা হলে আল্লাহকে রাযী ও সন্তুষ্ট করার মানসে প্রতিশোধ করতেন।

বুখারি হাদিস নং ৩৩০৯

হাদীস নং ৩৩০৯

সুলাইমান ইবনে হারব রহ……….আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতের তালু অপেক্ষা মোলায়েম কোন রেশম ও গরদকেও স্পর্শ করি নাই।

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরীর মোবারকের খুশব অপেক্ষা অধিকতর সুঘ্রাণ আমি কখনো পাই নাই।

বুখারি হাদিস নং ৩৩১০

হাদীস নং ৩৩১০

মুসাদ্দাদ রহ……….আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্তপুরবাসিনী পর্দানশীন কুমারীদের চেয়েও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন।

মুহাম্মদ রহ………শুবা রহ. থেকে অনুরূপ রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে। (তবে এ বাক্যটি অতিরিক্ত রয়েছে যে,) যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কিছু অপছন্দ করতেন তখন তাঁর চেহারা মুবারকে তা (বিরক্তির ভাব) দেখা যেত।

বুখারি হাদিস নং ৩৩১১

হাদীস নং ৩৩১১

আলী ইবনে জাদ রহ…………আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোন খাদ্যবস্তুকে মন্দ বলতেন না। রুচি হলে খেয়ে নিতেন নতুবা ত্যাগ করতেন।

বুখারি হাদিস নং ৩৩১২

হাদীস নং ৩৩১২

কুতাইবা ইবনে সাঈদ রহ………… আবদুল্লাহ ইবনে মালিক ইবনে বুহায়না রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সিজদা করতেন, তখন উভয় বাহুকে শরীর থেকে এমনভাবে পৃথক করে রাখতেন যে, আমরা তাঁর বগল দেখতে পেতাম। অন্য বর্ণনায় আছে, বগলের শুভ্রতা দেখতে পেতাম।

বুখারি হাদিস নং ৩৩১৩

হাদীস নং ৩৩১৩

আবদুল আলা ইবনে হাম্মাদ রহ………..আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইস্তিসকা (বৃষ্টির জন্য সালাত ও দু’আ) ব্যতীত অন্য কোন দু’আয় তাঁর বাহুদ্বয় এতটা উর্ধ্বে উঠাতেন না কেননা এতে হাত এত উর্ধ্বে উঠাতেন যে তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখা যেত।

আবু মূসা রহ. হাদীস বর্ণনায় বলেন, আনাস রা. বলেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’আর মধ্যে দুনু হাত উপরে উঠিয়েছেন ; এবং আমি তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখেছি।

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৩১৪

হাদীস নং ৩৩১৪

হাসান ইবনে সাব্বাহ রহ…………আবু জুহায়ফা রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে, (একদা) আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে নেয়া হল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আবতাহ নামক স্থানে দুপুর বেলায় একটি তাবুতে অবস্থান করছিলেন। বেলাল রা. তাবু থেকে বেরিয়ে এসে যুহরের সালাতের আযান দিলেন এবং (তাঁবুতে) পুনঃ প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অজুর অবশিষ্ট পানি নিয়ে বেরিয়ে এলেন।

লোকজন ইহা নেওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল। অতঃপর তিনি আবার তাঁবুতে ঢুকে একটি ছোট বর্শা নিয়ে বেরিয়ে আসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও (এবার) বেরিয়ে আসলেন।

আমি যেন তাঁর পায়ের গোছার ঔজ্জ্বল্য এখনো দেখতে পাচ্ছি। বর্শাটি সম্মুখে পুতে রাখলেন। এরপর যুহরের দু’রাকআত এবং পরে আসরের দু’রাকআত সালাত আদায় করলেন। বর্শার বাহির দিয়ে গাধা ও মহিলা চলাফেরা করছিল।

বুখারি হাদিস নং ৩৩১৫

হাদীস নং ৩৩১৫

হাসান ইবনে সাব্বাহ রহ………….আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে (থেমে থেমে) কথা বলতেন যে, কোন গণনাকারী গণনা করতে চাইলে তাঁর কথাগুলি গণনা করতে পারত।

লায়স রহ……….আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তুমি অমুকের (আবু হুরায়রা রা.) অবস্থা দেখে কি অবাক হও না? তিনি এসে আমার হুজরার পাশে বসে আমাকে শুনিয়ে হাদীস বর্ণনা করেন। আমি তখন (নফল) সালাতে ছিলাম।

আমার সালাত শেষ হওয়ার পূর্বেই তিনি উঠে চলে যান। তাকে যদি আমি পেতাম তবে আমি অবশ্যই তাকে সতর্ক করে দিতাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের মত দ্রুত কথা বলতেন না (বরং তিনি ধীরস্থির ও স্পষ্টভাবে কথা বলতেন)।

বুখারি হাদিস নং ৩৩১৬ – রাসূল (সা.) এর চোখ বন্ধ থাকত কিন্তু তাঁর অন্তর থাকত বিনিদ্র।

হাদীস নং ৩৩১৬

আবদুল্লাহ ইবনে মাসলামা রহ……….আবু সালামা ইবনে আবদুর রাহমান রহ. থেকে বর্ণিত যে, তিনি আয়েশা রা.-কে জিজ্ঞাসা করলেন, রমযান মাসে (রাতে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সালাত কিভাবে ছিল?

আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে ও অন্যান্য সব মাসের রাতে এগার রাকআতের বেশী সালাত আদায় করতেন না।

প্রথমে চার রাকআত পড়তেন। এ চার রাকআত আদায়ের সৌন্দের্যের ও দৈর্ঘ্যের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করোনা। (ইহা বর্ণনাতীত) তারপর আরো চার রাকআত সালাত আদায় করতেন। এ চার রাকআতের সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্যের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না।

তারপর তিন রাকআর (বিতর) আদায় করতেন। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আপনি বিতর সালাত আদায়ের পূর্বে ঘুমিয়ে পড়েন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার চক্ষু ঘুমায় তবে আমার অন্তর ঘুমায় না।

বুখারি হাদিস নং ৩৩১৭

হাদীস নং ৩৩১৭

ইসমাঈল রহ………..আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি মসজিদে কাবা থেকে রাতে অনুষ্ঠিত ইসরা -এর ঘটনা বর্ণনা করছিলেন, যে তিন ব্যক্তি (ফেরেশতা) তাঁর নিকট হাযির হলেন মিরাজ সম্পর্কে ওহী অবতরণের পূর্বে। তখন তিনি মসজিদুল হারামে ঘুমন্ত ছিলেন।

তাদের প্রথম জন বলল, তাদের (তিন জনের) কোন জন তিনি? (যেহেতু নবীজীর পাশে হামযা ও জাফর শুয়ে ছিলেন) মধ্যম জন উত্তর দিল, তিনিই (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের শ্রেষ্ঠ জন।

আর শেষজন বলল, শ্রেষ্ঠজনকে নিয়ে চল। এ রাত্রে এতটুকুই হল, এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাদেরকে আর দেখেন নাই। তারপর আর এক রাতে তাঁরা আগমন করল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্তর তা দেখতে পাচ্ছিল। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চোখ ঘুমাত কিন্তু তাঁর অন্তুর সদা জাগ্রত থাকত।

সকল আম্বিয়ায়ে কেরাম এর অবস্থা এরূপই ছিল যে, তাদের চোখ ঘুমাত কিন্তু অন্তর সদা জাগ্রত থাকত। তারপর জিবরাঈল আ. (ভ্রমণের) দায়িত্ব গ্রহণ করলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে আকাশের দিকে চড়তে লাগলেন।

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৩১৮ – ইসলাম আগমনের পর নবুওয়্যাতের নিদর্শনসমূহ।

হাদীস নং ৩৩১৮

আবুল ওয়ালিদ রহ…………ইমরান ইবনে হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত যে, এক সফরে (খায়বার যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন কালে) তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন।

সারারাত পথ চলার পর যখন ভোর নিকটবর্তী হল,তখন বিশ্রাম গ্রহণের জন্য থেমে গেলেন এবং গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়লেন। অবশেষে সূর্য উদিত হয়ে অনেক উপরে উঠে গেল, (কিন্তু কেউই জাগলেন না) (ইমরান রা. বলেন) যিনি সর্বপ্রথম ঘুম থেকে জাগলেন তিনি হলেন আবু বকর রা.।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বেচ্ছায় জাগ্রত না হলে তাকে জাগানো হত না। তারপর উমর রা. জাগলেন। আবু বকর রা. তাঁর শিয়রের নিকট গিয়ে বসে উচ্চস্বরে আল্লাহু আকবার বলতে লাগলেন।

অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেগে উঠলেন এবং অন্যত্র চলে গিয়ে অবতরণ করে আমাদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন।

তখন এক ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে সালাত আদায় না করে দূরে দাঁড়িয়ে রইল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাত শেষ করলেন তখন বললেন হে অমুক, আমাদের সাথে সালাত আদায় করতে কিসে বাধা দিল?

লোকটি বলল, আমি অপবিত্র হয়েছি। (গোসলে প্রয়োজন হয়েছিল) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পাক মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করার আদেশ দিলেন, তারপর সে সালাত আদায় করল। (ইমরান রা. বলেন) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অগ্রগামী দলের সাথে পাঠিয়ে দিলেন এবং আমরা ভীষণ তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লাম।

এমতাবস্থায় আমরা পথ চলছি। হঠাৎ এক উষ্ট্রারোহিণী মহিলা আমাদের নযরে পড়ল। সে পানি ভর্তি দুটি মষকের মধ্য খানে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল।

আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, পানি কোথায়? সে বলল, (আশেপাশে) কোথায়ও পানি নেই। আমরা বললাম, তোমার ও পানির জায়গার মধ্যে দূরত্ব কতটুকু? সে বলল, একদিন ও একরাতের দূরত্ব। আমরা তাকে বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট চল।

সে বলল, রাসূলুল্লাহ কি? আমরা তাকে যেতে না দিয়ে তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে নিয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে এসেও ঐ জাতীয় কথাবার্তাই বলল যা সে আমাদের সাথে বলেছিল।

তবে সে তাঁর নিকট বলল, সে কয়েকজন ইয়াতিম সন্তানের মাতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মশক দুটি নামিয়ে ফেলতে আদেশ করলেন। তারপর তিনি মশক দুটির মুখে হাত বুলালেন। আমরা তৃষ্ণাকাতর চল্লিশ জন মানুষ পানি পান করে পিপাসা নিবারণ করলাম।

তারপর আমাদের সকল মশক, বাসনপত্র পানি ভর্তি করে নিলাম। তবে উটগুলিকে পানি পান করান হয় নাই। এত সবের পরও মহিলার মশকগুলি এত পানি ভর্তি ছিল যে তা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল।

তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের নিকট (খাবার জাতীয়) যা কিছু আছে উপস্থিত কর। কিছু খেজুর ও রুটির টুকরা জমা করে তাকে দেয়া হল।

এ নিয়ে মহিলা আনন্দের সাথে তার গৃহে ফিরে গেল। গৃহে গিয়ে সকলের কাছে সে বলল, আমার সাক্ষাত হয়ে ছিল, এক মহাযাদুকরের সাথে অথবা মানুষ যাকে নবী বলে ধারণা করে তার সাথে।

আল্লাহ এই মহিলার মাধ্যমে ও বস্তিবাসীকে হেদায়াত দান করলেন। মহিলাটি নিজেও ইসলাম গ্রহণ করল এবং বস্তিবাসী সকলেই ইসলাম গ্রহণে ধন্য হল।

বুখারি হাদিস নং ৩৩১৯

হাদীস নং ৩৩১৯

মুহাম্মদ ইবনে বাশশার রহ……….আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটি একটি পানির পাত্র আনা হল, তখন তিনি (মদীনার নিকটবর্তী) যাওরা নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত মোবারক ঐ পাত্রে রেখে দিলেন আর তখনই পানি আঙ্গুলির ফাঁক দিয়ে উপচে পড়তে লাগল।

ঐ পানি দিয়ে উপস্থিত সকলেই অজু করে নিলেন। কাতাদা রা. বলেন, আমি আনাস রা.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার লোক সংখ্যা কত ছিল? তিনি বললেন, আমরা তিনশ অথবা তিনশ এর কাছাকাছি ছিলাম।

বুখারি হাদিস নং ৩৩২০

হাদীস নং ৩৩২০

আবদুল্লাহ ইবনে মাসলামা রহ……….আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে (এমন অবস্থায়) দেখতে পেলাম যখন আসরের সালাতের সময় নিকটবর্তী। সকলেই পেরেশান হয়ে পানি খুঁজছেন কিন্তু পানি পাওয়া যাচ্ছিল না।

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট অযুর পানি (একটি পাত্রসহ আনা হল) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে পাত্রে তাঁর হাত মোবারক রেখে দিলেন এবং সকলকে এ পাত্রের পানি দ্বারা অজু করতে আদেশ দিলেন।

আমি দেখলাম তাঁর হাত মোবারকের নীচ হতে পানি সজোরে উথলে পড়ছিল। কাফেলার শেষ ব্যক্তিটি পর্যন্ত সকলেই এই পানি দিয়ে অজু করে নিলেন।

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৩২১

হাদীস নং ৩৩২১

আবদুর রাহমান ইবনে মুবারক রহ……….আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক সফরে বের হয়েছিলেন। তাঁর সাথে সাহাবায়ে কেরামও ছিলেন।

তারা চলতে লাগলেন, (আনাস রা. নিজেই) সামান্য পানিসহ একটি পেয়ালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত করলেন।

তিনি পেয়ালাটি হাতে নিয়ে তারই পানি দ্বারা অজু করলেন এবং তাঁর হাতের চারটি আঙ্গুল পেয়ালার মধ্যে সোজা করে ধরে রাখলেন। আর বললেন, উঠ তোমরা সকলে অজু কর। সকলেই ইচ্ছামত অজু করে নিলেন। তাদের সংখ্যা সত্তর বা এর কাছাকাছি ছিল।

বুখারি হাদিস নং ৩৩২২

হাদীস নং ৩৩২২

আবদুল্লাহ ইবনে মুনীর রহ………..আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সালাতের সময় উপস্থিত হল (কিন্তু পানির ব্যবস্থা ছিলনা) যাদের বাড়ী মসজিদের নিকটে ছিল তারা অজু করার জন্য নিজ নিজ বাড়ীতে চলে গেলেন।

কিন্তু কিছু সংখ্যক লোক থেকে গেলেন। (যাদের অজুর কোন ব্যবস্থা ছিলনা) তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে প্রস্তর নির্মিত একটি (ছোট) পাত্র আনা হল। এতে সামান্য পানি ছিল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ পাত্রে তাঁর হাত মোবারক রাখলেন। কিন্তু পাত্রটি ছোট বিধায় হাতের আঙ্গুলগুলো প্রসারিত করতে পারলেন না বরং একত্রিত করে রেখে দিলেন।

তারপর উপস্থিত সকলেই ঐ পানি দ্বারাই অজু করে নিল। হুমাইদ (একজন রাবী) রহ. বলেন, আমি আনাস রা.-কে জিজ্ঞাসা করলাম। আপনারা কতজন ছিলেন? তিনি বললেন, আশি জন।

বুখারি হাদিস নং ৩৩২৩

হাদীস নং ৩৩২৩

মূসা ইবনে ইসমাঈল রহ………..জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুদায়বিয়ার অবস্থান কালে একদিন সাহাবা কেরাম পীপাসায় অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মুখে একটি (চামড়ার) পাত্রে অল্প পানি ছিল। তিনি অজু করলেন।

তাঁর নিকট পানি আছে মনে করে সকলে ঐদিকে ধাবিত হলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের কি হয়েছে? তাঁরা বললেন, আপনার সম্মুখস্থ পাত্রের সামান্য পানি ব্যতীত অজু ও পান করার মত পানি আমাদের নিকট নাই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ পাত্রে তাঁর হাত মোবারক রাখলেন। তখনই তাঁর হাত উপচিয়ে ঝর্ণা ধারার ন্যায় পানি ছুটিয়ে বের হতে লাগল। আমরা সকলেই পানি পান করলাম ও অজু করলাম।

সালিম (একজন রাবী) বলেন আমি জাবির রা.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনারা কতজন ছিলেন ? তিনি বললেন, আমরা যদি এক লক্ষও হতাম তবুও আমাদের জন্য পানি যথেষ্ট হত। তবে আমরা ছিলাম মাত্র পনরশ।

বুখারি হাদিস নং ৩৩২৪

হাদীস নং ৩৩২৪

মালিক ইবনে ইসমাঈল রহ………বারা রা. থেকে বর্ণিত, তিনিন বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হুদায়বিয়ায় চৌদ্দশ লোক ছিলাম। হুদায়বিয়া একটি কূপ, আমরা তা হতে পানি এমনভাবে উঠিয়ে নিলাম যে তাতে এক ফোটা পানিও বাকী থাকল না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কূপের কিনারায় বসে কিছু পানি আনার জন্য আদেশ করলেন। (সামান্য পানি আনা হল) তিনি কুলি করে ঐ পানি কূপে নিক্ষেপ করলেন।

কিছু সময় অপেক্ষা করলাম। তখন কূপটি পানিতে ভরে গেল। আমরা পান করে তৃপ্তি লাভ করলাম, আমাদের উটগুলোও পানি পানে তৃপ্ত হল। অথবা বলেছেন আমাদের উটগুলো পানি পান করে প্রত্যাবর্তন করল।

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৩২৫

হাদীস নং ৩৩২৫

আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ রহ………..আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু তালহা রা. তদীয় (পত্নী) উম্মে সুলাইমকে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কণ্ঠস্বর দুর্বল শুনেছি। আমি তাঁর মধ্যে ক্ষুধা বুঝতে পেরেছি। তোমার নিকট খাবার কিছু আছে কি?

তিনি বললেন, হ্যাঁ, আছে। এই বলে তিনি কয়েকটি যবের রুটি বের করলেন। তারপর তাঁর একখানা ওড়না বের করে এর কিয়দংশ দিয়ে রুটিগুলো মুড়ে আমার হাতে গোপন করে রেখে দিলেন ও ওড়নার অপর অংশ আমার শরীর জড়িয়ে দিলেন এবং আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে পাঠালেন।

রাবী আনাস রা. বলেন, আমি তাঁর নিকট গেলাম। ঐ সময় তিনি কতিপয় লোকসহ মসজিদে অবস্থান করছিলেন। আমি গিয়ে তাদের সম্মুখে দাঁড়ালাম।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দেখে বললেন, তোমাকে আবু তালহা পাঠিয়েছে? আমি বললাম জি হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে পাঠিয়েছে? আমি বললাম, জি হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গীদেরকে বললেন, চল, আবু তালহা আমাদেরকে দাওআত করেছে।

আমি তাদের আগেই চলে গিয়ে আবু তালহা রা.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমন বার্তা শুনালাম। ইহা শুনে আবু তালহা রা. বলেন, হে উম্মে সুলাইম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গী সাথীদেরকে নিয়ে আসছেন।

তাদেরকে খাওয়ানোর মত কিচু আমাদের নিকট নেই। উম্মে সুলাইম রা. বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন।

আবু তালহা রা. তাদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য বাড়ী হতে কিছুদূর অগ্রসর হলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাত করলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু তালহা রা.-কে সঙ্গে নিয়ে তার ঘরে আসলেন, আর বললেন, হে উম্মে সুলাইম।

তোমার নিকট যা কিছু আছে নিয়ে এসো। তিনি যবের ঐ রুটিগুলি হাযির করলেন এবং তাঁর নির্দেশে রুটিগুলো টুকরা টুকরা করা হল। উম্মে সুলাইম ঘিয়ের পাত্র ঝেড়ে মুছে কিছু ঘি বের করে তা তরকারী স্বরূপ পেশ করলেন।

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠ করে তাতে ফুঁ দিলেন এরপর দশজনকে নিয়ে আসতে বললেন। তাঁরা দশজন আসলেন এবং রুটি খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন।

তারপর আরো দশজনকে আসার কথা বলা হল। তারা আসলেন রুটি খেয়ে পরিতৃপ্ত সহকারে রুটি খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন। আবার আরো দশজনকে আসতে বলা হল।

তাঁরাও আসলেন এবং পেটভরে খেয়ে নিলেন। অনুরূপভাবে সমবেত সকলেই রুটি খেয়ে পরিতৃপ্ত হলেন। লোকজন সর্বমোট সত্তর বা আশিজন ছিলেন।

বুখারি হাদিস নং ৩৩২৬

হাদীস নং ৩৩২৬

মুহাম্মদ ইবনে মুসান্না রহ………..আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা (সাহাবাগণ) অলৌকিক ঘটনাসমূহকে বরকত ও কল্যাণকর মনে করতাম আর তোমরা (যারা সাহাবী নও) ঐ সব ঘটনাকে ভীতিকর মনে কর। আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোন সফরে ছিলাম।

আমাদের পানি কমিয়ে আসল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অতিরিক্ত পানি তালাশ কর।(তালাশের পর) সাহাবাগণ একটি পাত্র নিয়ে আসলেন যার ভিতর সামান্য পানি ছিল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত মোবারক ঐ পাত্রের ভিতর ঢুকায়ে দিলেন এবং ঘোষণা করলেন, বরকতময় পানি নিতে সকলেই এসো। এ বরকত আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে।

তখন আমি দেখতে পেলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে পানি উপচে পড়ছে। সময় বিশেষে আমরা খাদ্য-দ্রব্যের তাসবীহ পাঠ শুনতাম আর তা খাওয়া হত।

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৩২৭

হাদীস নং ৩৩২৭

আবু নুআইম রহ………..জাবির রা. থেকে বর্ণিত যে, তাঁর পিতা ঋণ রেখে শাহাদাত বরণ করেন। তখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললাম, আমার পিতা অনেক ঋণ রেখে গেছেন। আমার নিকট বাগানের উৎপন্ন কিছু খেজুর ব্যতীত অন্য কোন সম্পদ নেই।

কয়েক বছরের উৎপাদিত খেজুর একত্রিত করলেও তদ্বারা তাঁর ঋণ শোধ হবে না। আপনি দয়া করে আমার সাথে চলুন, যাতে পাওনাদারগণ (আপনাকে দেখে) আমার প্রতি কঠোর মনোভাব গ্রহণ না করে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথে গেলেন এবং খেজুরের একটি স্তুপের চারদিক ঘুরে দু’আ করলেন। এরপর অন্য স্তুপের নিকটে গেলেন এবং এর নিকটে বসে পড়লেন এবং জাবির রা.-কে বললেন, খেজুর বের করে দিতে থাক।

অতঃপর সকল পাওনাদারের প্রাপ্য শোধ করে দিলেন অথচ পাওনাদারদের যা দিলেন তার সমপরিমাণ রয়ে গেল।

বুখারি হাদিস নং ৩৩২৮

হাদীস নং ৩৩২৮

মূসা ইবনে ইসমাঈল রহ………..আবদুর রাহমান ইবনে আবু বকর রা. বর্ণনা করেন, আসহাবে সুফফার কতিপয় অসহায় দরিদ্র লোক ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বললেন, যার ঘরে দুজনের পরিমাণ খাবার আছে সে যেন এদের মধ্য থেকে তৃতীয় একজন নিয়ে যায়।

আর যার ঘরে চার জনের পরিমাণ খাবার আছে সে এদের মধ্য থেকে পঞ্চম একজন বা ষষ্ঠ একজনকে নিয়ে যায় অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন।

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিলেন দশজন এবং আবু বকর রা. তিনজন নিলেন। আবদুর রাহমান রা. বলেন, (আমরা বাড়ীতে ছিলাম তিনজন) আমি আমার আব্বা ও আম্মা। আবু উসমান রা. রাবী বলেন, আমার মনে নাই আবদুর রাহমান রা. কি ইহাও বলেছিলেন যে আমার স্ত্রী ও আমাদের পিতা-পুত্রের একজন গৃহভৃত্যও ছিল।

আবু বকর রা. ঐ রাতে নবীজীর বাড়ীতেই খেয়ে নিলেন এবং ইশার সালাত পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করলেন। ইশার সালাতের পর পুনরায় তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গৃহে গমন করলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রাতের আহার গ্রহণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তথায় অবস্থান করলেন। অনেক রাতের পর গৃহে ফিরলেন। তখন তাঁর স্ত্রী তাকে বললেন, মেহমান পাঠিয়ে দিয়ে আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন? তিনি বললেন, তাদের কি এখনো রাতের আহার দেওনি।

স্ত্রী বললেন, আপনার না আসা পর্যন্ত তারা আহার খেতে রাযী হননি। তাদেরকে ঘরের লোকজন আহার দিয়েছিল। কিন্তু তাদের অসম্মতির নিকট আমাদের লোকজনে হার মানতে হয়েছে। আবদুর রাহমান রা. বলেন, আমি (অবস্থা বেগতিক দেখে) তাড়াতাড়ি কেটে পড়লাম।

আবু বকর রা. (আমাকে উদ্দেশ্য করে) বললেন, ওরে বেওকুফ? আহস্মক! আরো কিছু কড়া কথা বলে ফেললেন। তারপর মেহমান পক্ষকে সম্বোধন করে বললেন, আপনারা খেয়ে নিন। আমি কিছুতেই খাবনা। (মধ্যে আরো কিছু কথা কাটাকাটি হয়ে গেল অবশেষে সকলেই খেতে বসলেন।

আবদুর রাহমান রা. বলেন, আল্লাহর কসম, আমরা যখন গ্রাস তুলে নেই তখন দেখি পাত্রের খাবার অনেক বেড়ে যায়। খাওয়ার শেষে আবু বকর রা. লক্ষ্য করলেন যে পরিতৃপ্তভাবে আহারের পরও পাত্রে খাবার পূর্বাপেক্ষা অধিক রয়ে গেছে। তখন স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বললেন, হে বনী ফিরাস গোত্রের বোন, ব্যাপার কি?

তিনি বললেন, হে আমার নয়নমণি। খাদ্যের পরিমাণ এখন তিন গুণের চেয়েও অধিক রয়েছে। আবু বকর রা. তা থেকে কয়েক গ্রাস খেলেন এবং বললেন, আমার কসম শয়তানের প্ররোচনায় ছিল।

তারপর অবশিষ্ট খাদ্য র-এর নিকট নিয়ে গেলেন এবং ভোর পর্যন্ত ঐ খাদ্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হেফাযতে রইল । রাবী বলেন, আমাদের ও অন্য একটি গোত্রের মধ্যে সন্ধি ছিল।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়াতে তাদের মোকাবেলা করার জন্য আমাদের বার জনকে নেতা মনোনীত করা হল। প্রত্যেক নেতার অধীনে আবার কয়েক জন করে লোক ছিল।

আল্লাহই ভাল জানেন তাদের প্রত্যেকের সাথে কতজন করে দেয়া হয়েছিল। আবদুর রাহমান রা. বলেন, এদের প্রত্যেকেই এ খাবার থেকে খেয়ে নিলেন। অথবা তিনি যা বলেছেন।

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৩২৯

হাদীস নং ৩৩২৯

মুসাদ্দাদ রহ………আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে একবার মদীনাবাসী অনাবৃষ্টির দরুন (দুর্ভিক্ষে) পতিত হল।

ঐ সময় কোন এক জুমুআর দিনে খুতবা দিয়েছিলেন, তখন এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়াল, এবং বলল ইয়া রাসূলাল্লাহ! (অনাবৃষ্টির কারণে) ঘোড়াগুলো নষ্ট হয়ে গেল, বকরীগুলো ধ্বংস হয়ে গেল। আল্লাহর দরবারে বৃষ্টির জন্য দু’আ করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষণাৎ দু’হাত উঠিয়ে দু’আ করলেন।

আনাস রা. বলেন, তখন আকাশ স্কটিক সদৃশ্য নির্মল ছিল। হঠাৎ মেঘ সৃষ্টিকারী বাতাস বইতে শুরু করল। এবং মেঘ ঘনিভূত হয়ে গেল। তারপর শুরু হল প্রবল বারিপাত যেন আকাশ তার দ্বার উন্মুক্ত করে দিল। আমরা (সালাত শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে) পানি ভেঙ্গে বাড়ী পৌঁছলাম।

পরবর্তী শুক্রবার পর্যন্ত অনবরত বৃষ্টিপাত হল। ঐ শুক্রবার জুমুআর সময় ঐ ব্যক্তি বা অন্য কোন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! (অতিবৃষ্টির কারণে) গৃহগুলো বিনে) মুচকি হাসলেন এবং বললেন, (হে আল্লাহ!) আমাদের আশে পাশে বৃষ্টি হউক।

আমাদের উপর নয়। (আনাস রা. বধ্বস্ত হয়ে গেল। বৃষ্টি বন্ধের জন্য আল্লাহর দরবারে দু’আ করুন।

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তাঁর কথা শুলেন) তখন আমি দেখলাম, মদীনার আকাশ থেকে মেঘমালা চতুর্দিক সরে গেছে আর মদীনা (যেন মেঘমুক্ত হয়ে) মুকুটের ন্যায় শোভা পাচ্ছে।

বুখারি হাদিস নং ৩৩৩০

হাদীস নং ৩৩৩০

মুহাম্মদ ইবনে মুসান্না রহ………ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মসজিদে) খেজুরের একটি কাণ্ডের সাথে (হেলান দিয়ে) খুতবা প্রদান করতেন।

যখন মিম্বর তৈরী করে দেয়া হল। তখন তিনি মিম্বরে উঠে খুতবা দিতে লাগলেন। কাণ্ডটি তখন (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরহে) কাঁদাতে শুরু করল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাণ্ডটির নিকটে গিয়ে হাত বুলাতে লাগলেন। (তখন স্তম্ভটি শান্ত হল) উপরোক্ত হাদীসটি আবদুল হামীদ ও আবু আসিম রহ……ইবনে উমর রা. সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

বুখারি হাদিস নং ৩৩৩১

হাদীস নং ৩৩৩১

আবু নুআইম রহ……….জারিব ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি বৃক্ষের উপর কিংবা একটি খেজুর বৃক্ষের কাণ্ডের উপর (হেলান দিয়ে) শুক্রবারে খুতবা প্রদানের জন্য দাঁড়াতেন।

এমতাবস্থায় একজন আনসারী মহিলা অথবা একজন পুরুষ বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার জন্য একটি মিম্বর তৈরী করে দেব কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের ইচ্ছে হলে দিতে পার।

অতঃপর তারা একটি কাঠের মিম্বর তৈরী করে দিলেন। যখন শুক্রবার এল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে আসন গ্রহণ করলেন, তখন কাণ্ডটি শিশুর ন্যায় চীৎকার করে কাঁদতে লাগল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বর হতে নেমে এসে উহাকে জড়িয়ে ধরলেন।

কিন্তু কাণ্ডটি (আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে) শিশুর মত আরো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। রাবী বলেন, কাণ্ডটি এজন্য কাঁদছিল যেহেতু সে খুতবা কালে অনেক যিকর শুনতে পেত।

বুখারি হাদিস নং ৩৩৩২

হাদীস নং ৩৩৩২

ইসমাঈল রহ……….জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত যে, প্রথম দিকে খেজুরের কয়েকটি কাণ্ডের উপর মসজিদে নববীর ছাদ করা হয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই খুতবা প্রদানের ইচ্ছা করতেন, তখন একটি কাণ্ডে হেলান দিয়ে দাঁড়াতেন। অতঃপর তাঁর জন্য মিম্বর তৈরী করে দেওয়া হলে তিনি সেই মিম্বরে উঠে দাঁড়াতেন।

ঐ সময় আমরা কাণ্ডটির ভিতর থেকে দশ মাসের গর্ভবতী উষ্ট্রীর স্বরের ন্যায় কান্নার আওয়াজ শুনলাম। অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকটে এসে তাকে হাত বুলিয়ে সোহাগ করলেন। তারপর কাণ্ডটি শান্ত হল।

বুখারি হাদিস নং ৩৩৩৩

হাদীস নং ৩৩৩৩

মুহাম্মদ ইবনে বাশশার রহ. ও বিশর ইবনে খালিদ রহ………..উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যে কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফিতনা সম্পর্কীয় হাদীস স্মরণ রেখেছ? যেমনভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন। হুযায়ফা রা. বললেন, আমিই সর্বাধিক স্মরণ রেখেছি।

উমর রা. বললেন, বর্ণনা কর, তুমি তো, অত্যন্ত সাহসী ব্যক্তি। হুযায়ফা রা. বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষের পরিবার-পরিজন ধন-সম্পদ এবং প্রতিবেশী দ্বারা সৃষ্ট ফিতনা-ফাসাদের ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে সালাত, সাদকা এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ প্রদানের দ্বারা।

উমর রা. বললেন, আমি এ জাতীয় ফিতনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিনি বরং উদ্বেলিত সাগর তরঙ্গের ন্যায় ভীষণ আঘাত হানে ঐ জাতীয় ফিতনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। হুযায়ফা রা. বলেন, হে আমীরুল মুমিনীন ! এ জাতীয় ফিতনা সম্পর্কে আপনার শঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ নেই।

আপনার এবং এ জাতীয় ফিতনার মধ্যে একটি সুদৃঢ় কপাট বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। উমর রা. জিজ্ঞাসা করলেন, এ কপাটটি কি (সাধারণ নিয়মে) খোলা হবে, না ভেঙ্গে ফেলা হবে। হুযায়ফা রা. বলেন, ভেঙ্গে ফেলা হবে। উমর রা. বললেন, তাহলে এ কপাটটি আর সহজে বন্ধ করা যাবে না।

আমরা (সাহাবীগণ) হুযায়ফাকে জিজ্ঞাসা করলাম, উমর রা. কি জানতেন ঐ কপাট দ্বারা কাকে বুঝানো হয়েছে ? তিনি বললেন, অবশ্যই যেমন নিশ্চিতভাবে জানতেন আগামী দিনের পূর্বে অদ্য রাতের আগমন অনিবার্য।

আমি তাতে এমন একটি হাদীস শুনিয়েছি, যাতে ভুল-ভ্রান্তির অবকাশ নেই। আমরা হুযায়ফাকে ভয়ে জিজ্ঞাসা করতে সাহস পাইনি, তাই মাসরূককে বললাম, (তুমি জিজ্ঞাসা কর) মাসরূক রহ. জিজ্ঞাসা করলেন ঐ বন্ধ কপাট দ্বার উদ্দেশ্য কে ? হুযায়ফা রা. বললেন, উমর রা. স্বয়ং।

বুখারি হাদিস নং ৩৩৩৪

হাদীস নং ৩৩৩৪

আবুল ইয়ামান রহ……….আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না ততক্ষণ, যতক্ষণ না তোমাদের যুদ্ধ হবে এক জাতির সঙ্গে যাদের পায়ের জুতা হবে পশমের এবং যতক্ষণ না তোমাদের যুদ্ধ হবে তুর্কিদের সহিত যাদের চক্ষু ক্ষুদ্রাকৃতি, নাক চেপ্টা, চেহারা লাল বর্ণ যেন তাদের চেহারা পেটানো ঢাল।

তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ খনির ন্যায় (এতে ভাল মন্দ সবই আছে) যারা জাহিলিয়্যাতের যুগে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম ইসলাম গ্রহণের পরও তারা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম।

তোমাদের নিকট এমন যুগ আসবে যখন তোমাদের পরিবার-পরিজনরা, ধন-সম্পদের অধিকারী হওয়ার চাইতেও আমার সাক্ষাত লাভ তার কাছে অত্যন্ত প্রিয় মনে হবে।

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৩৩৫

হাদীস নং ৩৩৩৫

ইয়াইহয়া রহ……..আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হবেনা যে পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ না হবে খুয ও কিরমান নামক স্থানে (বসবাসরত) অনারব জাতিগুলির সাথে, যাদের চেহারা লালবর্ণ, চেহারা যেন পিটানো ঢাল, নাক চেপ্টা, চক্ষু ক্ষুদ্রাকৃতি এবং জুতা পশমের।

ইয়াহইয়া ব্যতীত অন্যান্য রাবীগণ ও আবদুর রাজ্জাক রহ. থেকে পূর্বের হাদীস বর্ণনায় তার অনুসরণ করেছেন।

বুখারি হাদিস নং ৩৩৩৬

হাদীস নং ৩৩৩৬

আলী ইবনে আবদুল্লাহ রহ………..আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্যে তিনটি বছর কাটিয়েছি।

আমার জীবনে হাদীস মুখস্থ করার আগ্রহ এ তিন বছরের চেয়ে অধিক আর কখনো ছিল না। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হাত দ্বারা এভাবে ইশারা করে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের পূর্বে তোমরা এমন এক জাতির সাথে যুদ্ধ করবে যাদের জুতা হবে পশমের এরা হবে পারস্যবাসী অথবা পাহাড়বাসী অনারব।

বুখারি হাদিস নং ৩৩৩৭

হাদীস নং ৩৩৩৭

সুলাইমান ইবনে হারব রহ……….আমর ইবনে তাগলিব রা. বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, তোমরা কিয়ামতের পূর্বে এমন এক জাতির সাথে যুদ্ধ করবে যারা পশমের জুতা ব্যবহার করে এবং তোমরা এমন এক জাতির সাথে যুদ্ধ করবে যাদের চেহারা হবে পিটানো ঢালের ন্যায়।

বুখারি হাদিস নং ৩৩৩৮

হাদীস নং ৩৩৩৮

হাকাম ইবনে নাফে রহ………..আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে শুনেছি, ইয়াহুদীরা তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে।

তখন বিজয়ী হবে তোমরাই। (এমনকি পাথরের আড়ালে কোন ইয়াহুদী আত্মগোপন করে থাকলে) স্বয়ং পাথরই বলবে, হে মুসলিম, এই ত ইয়াহুদী, আমার পিছনে আত্মগোপন করেছে, একে হত্যা কর।

বুখারি হাদিস নং ৩৩৩৯

হাদীস নং ৩৩৩৯

কুতাইবা রহ……….আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষের নিকট এমন এক সময় আসবে যে, তারা জিহাদ করবে।

তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তি আছেন কি? যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্য লাভ করেছেন? তখন তারা বলবে, হ্যাঁ।

তখন (ঐ সাহাবীর বরকতে) তাদেরকে জয়ী করা হবে। এরপরও তারা আরো জিহাদ করবে। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি যিনি সাহাবা কেরামের সাহচর্য লাভ করেছেন ? তখন তারা বলবে, হ্যাঁ।

তখন (ঐ তাবেবীর তুফায়েলে) তাদেরকে জয়ী করা হবে।

বুখারি হাদিস নং ৩৩৪০

হাদীস নং ৩৩৪০

মুহাম্মদ ইবনে হাকাম রহ………আদি ইবনে হাতিম রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মজলিসে বসা ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি এসে দুর্ভিক্ষের অভিযোগ করল। তারপর আর এক ব্যক্তি এসে ডাকাতের উৎপাতের কথা বলে অভিযোগ করল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আদী, তুমি কি হীরা নামক স্থানটি দেখেছ, আমি বললাম, দেখি নাই, তবে স্থানটি আমার জানা আছে।

তিনি বললেন, তুমি যদি দীর্ঘজীবী হও তবে দেখতে পাবে একজন উট সওয়ার হাওদানশীন মহিলা হীরা থেকে রওয়ানা হয়ে বায়তুল্লাহ শরীফে তাওয়াফ করে যাবে। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও ভয় করবেনা। আমি মনে মনে বলতে লাগলাম তাঈ গোত্রের ডাকাতগুলো কোথায় থাকবে যারা ফিতনা ফাসাদের আগুন জ্বালিয়ে দেশকে ছারখার করে দিচ্ছে।

তিনি বললেন, তিনি বলেন, তুমি যদি দীর্ঘজীবী হও, তবে নিশ্চয়ই দেখতে পাবে যে কিসরার ধনভাণ্ডার কবজা করা হয়েছে। আমি বললাম, কিসরা ইবনে হুরমুযের ?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, কিসরা ইবনে হুরমুযের। তোমার আয়ু যদি দীর্ঘ হয়, তবে অবশ্য তুমি দেখতে পাবে, লোকজন মুষ্টিভরা যাকাতের স্বর্ণ-রৌপ্য নিয়ে বের হবে এবং এমন ব্যক্তিকে তালাশ করে বেড়াবে যে তাদের এ মাল গ্রহণ করে।

নৈতিক গুণাবলী অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

কিন্তু গ্রহণকারী একটি মানুষও পাবেনা। তোমাদের নিকট আমার বাণী পৌঁছানোর জন্য রাসূল প্রেরণ করিনি? সে বলবে, হ্যাঁ, প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ বলবেন, আমি কি তোমাকে ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি দান করিনি এবং দয়া মেহেরবাণী করিনি? তখন সে বলবে, হ্যাঁ দিয়েছেন।

তারপর সে ডান দিকে নযর করবে, জাহান্নাম ব্যতীত কিছুই দেখবে না। আদী রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, অর্ধেকটি খেজুর দান করে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা কর আর যদি তাও করার তৌফিক না হয় তবে মানুষের জন্য মঙ্গলজনক সৎ ও ভাল কথা বলে নিজেকে আগুন থেকে রক্ষা কর।

আদী রা. বলেন, আমি নিজে দেখেছি, এক উট সওয়ার মহিলা হীরা থেকে একাকী রওয়ানা হয়ে কাবা শরীফ তাওয়াফ করেছে। সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও ভয় করেনা।

আর পারস্য সম্রাট কিসরা ইবনে হুরমুযের ধনভাণ্ডার যারা দখল করেছিল, তাদের মধ্যে আমি একজন ছিলাম। যদি তোমরা দীর্ঘজীবী হও, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন, তা স্বচক্ষে দেখতে পাবে। (অর্থাৎ মুষ্টিভরা স্বর্ণ দিতে চাইলে কিন্তু কেউ নিতে চাইবেনা)।

আরও পড়ুনঃ

আম্বিয়া কিরাম (আ.) অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

আম্বিয়া কিরাম (আ.) অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

আম্বিয়া কিরাম (আ.) অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

আম্বিয়া কিরাম (আ.) অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

আম্বিয়া কিরাম (আ.) অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

মন্তব্য করুন