জিহাদ অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৫ম খণ্ড

জিহাদ অধ্যায়

জিহাদ অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

Table of Contents

জিহাদ অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৮০০ – বন্দীদের পোশাক প্রদান।

হাদীস নং ২৮০০

আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ রহ……….জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন বদর যুদ্ধের দিন কাফির বন্দীদেরকে হাযির করা হল এবং আব্বাস রা.-কেও আনা হল তখন তাঁর শরীরে পোশাক ছিলনা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শরীরের জন্য উপযোগী জামা খুজতে গিয়ে দেখলেন আবদুল্লাহ ইবন উবাই এর জামা তাঁর গায়ের উপযোগী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে জামাটি তাকেই পরিয়ে দেন।

এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ জামা খুলে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে (তার মৃত্যুর পর) পরিয়ে দিয়েছিলেন।

ইবনে উয়াইনাহ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-এর একটি সৌজন্য আচরণ ছিল, তাই তিনি তার প্রতিদান দিতে চেয়েছেন।

বুখারি হাদিস নং ২৮০১ – যার হাতে কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে তার ফযীলত।

হাদীস নং ২৮০১

কুতাইবা ইবনে সাঈদ রহ……….সাহল রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার যুদ্ধের দিন বলেন, আগমীকাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে পতাকা দিব, যার হাতে আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করবেন।

সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে, আর আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল তাকে ভালবাসে। লোকেরা সারা রাত এ চিন্তায় কাটিয়ে দেয় যে, কাকে পতাকা দেওয়া হয়? পরদিন সকালে প্রত্যেকেই এ আশায় অপেক্ষা করতে লাগলেন যে, হয়ত তাকে পতাকা দেয়া হবে।

কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আলী কোথায়? বলা হল যে, তিনি চক্ষুরোগে আক্রান্ত। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মুখের লালা তাঁর চোখে লাগিয়ে দিলেন এবং দু’আ করলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি এমনভাবে সুস্থ হয়ে গেলেন যে, তাঁর কোন অসুখই ছিল না।

তারপর তাঁর হাতে পতাকা দিলেন। আলী রা. জিজ্ঞাসা করলেন, আমি তাদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ লড়াই চালিয়ে যাব, যতক্ষণ না তারা আমাদের মত হয়ে যায়।

তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি স্বাভাবিকভাবে অগ্রসর হয়ে তাদের আঙিনায় অবতরণ কর। তারপর তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান কর এবং তাদের করণীয় সম্বন্ধে তাদের অবহিত কর।

আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাআলা যদি তোমার মাধ্যমে এক ব্যক্তিকে হিদায়েত দান করে, তবে তা তোমার জন্য লাল রংয়ের উটের মালিক হওয়া অপেক্ষা শ্রেয়।

বুখারি হাদিস নং ২৮০২ – শৃঙ্খলে আবদ্ধ কয়েদী।

হাদীস নং ২৮০২

মুহাম্মদ ইবনে বাশশার রহ…………আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা সে সকল লোকের উপর সন্তুষ্ট হন, যারা শৃঙ্খলে আবদ্ধ অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবে।

জিহাদ অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৮০৩ – ইয়াহুদী ও নাসারাদের থেকে যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার মর্যাদা।

হাদীস নং ২৮০৩

আলী ইবনে আবদুল্লাহ রহ………..আবু মূসা আশআরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তিন প্রকারের ব্যক্তিকে দ্বিগুণ সাওয়াব দান করা হবে। যে ব্যক্তির একটি বাঁদী আছে, সে তাকে শিক্ষা দান করে, শিষ্টাচার শিক্ষা এবং তাকে উত্তমরূপে শিষ্টাচার শিক্ষা দান করে।

তারপর তাকে আযাদ করে দিয়ে তাকে বিয়ে করে। সে ব্যক্তির জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব রয়েছে। আর আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে মু’মিন ব্যক্তি যে তার নবীর প্রতি ঈমান এনেছিল।

তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ঈমান এনেছে। তার জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব রয়েছে।

যে গোলাম আল্লাহর হক যথাযথভাবে আদায় করে এবং স্বীয় মনীবের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, (তার জন্যও দ্বিগুণ সাওয়াব রয়েছে) শাবী রহ. এ হাদীসটি বর্ণনা করে সালেহকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি তোমাকে এ হাদীসটি কোন বিনিময় ছাড়াই শুনিয়েছি। অথচ এর চেয়ে সহজ হাদীস শোনার জন্য লোকেরা মদীনা পর্যন্ত সফর করতেন।

বুখারি হাদিস নং ২৮০৪ – রাত্রীকালীন আক্রমণে মুশরিকদের মহিলা ও শিশু নিহত হলে।

হাদীস নং ২৮০৪

আলী ইবনে আবদুল্লাহ রহ………..সাব ইবনে জাসসামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবওয়া অথবা ওয়াদ্দান নামক স্থানে আমার কাছে দিয়ে পথ অতিক্রম করেন।

তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, যে মুশরিকদের সঙ্গে যুদ্ধ হচ্ছে, যদি রাত্রিকালীন আক্রমণে তাদের মহিলা ও শিশুগণ নিহত হয়, তবে কি হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারাও তাদেরই অন্তর্ভূক্ত।

আর আমি তাকে আরো বলতে শুনেছি যে, সংরক্ষিত চারণভূমি আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত আর কারো জন্য হতে পারে না।

বুখারি হাদিস নং ২৮০৫ – যুদ্ধে শিশুদের হত্যা করা।

হাদীস নং ২৮০৫

আহমদ ইবনে ইউনুস রহ……….আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক যুদ্ধে জনৈক মহিলাকে নিহত পাওয়া যায়, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলা ও শিশুদের হত্যা করা সম্পর্কে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

বুখারি হাদিস নং ২৮০৬ – যুদ্ধে মহিলাদের হত্যা করা।

হাদীস নং ২৮০৬

ইসহাক ইবনে ইবরাহীম রহ………ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন এক যুদ্ধে জনৈক মহিলাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলা ও শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করেন।

জিহাদ অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৮০৭ – আল্লাহ তাআলার শাস্তি দ্বারা কাউকে শাস্তি দেয়া যাবে না।

হাদীস নং ২৮০৭

কুতাইবা ইবনে সাঈদ রহ……….আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে কোন এক অভিযানে প্রেরণ করেন এবং বলেন, তোমরা যদি অমুক ও অমুক ব্যক্তিকে পাও, তবে তাদের উভয়কে আগুনে জ্বালিয়ে দিবে।

তারপর আমরা যখন বের হতে চাইলাম, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কিন্তু আগুন দ্বারা শাস্তি দেওয়া আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কারও জন্য সমীচীন নয়। কাজেই তোমরা যদি তাদের উভয়কে পেয়ে যাও, তবে তাদেরকে হত্যা কর।

বুখারি হাদিস নং ২৮০৮

হাদীস নং ২৮০৮

আলী ইবনে আবদুল্লাহ রহ……….ইকরামা রা. থেকে বর্ণিত, আলী রা. এক সম্প্রদায়কে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। এ সংবাদ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন, যদি আমি হতাম, তবে আমি তাদেরকে জ্বালিয়ে ফেলতাম না।

কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আল্লাহ নির্ধারিত শাস্তি দ্বারা কাউকে শাস্তি দিবে না। বরং আমি তাদেরকে হত্যা করতাম।

যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার দীন পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করে ফেল।

বুখারি হাদিস নং ২৮০৯ – মুশরিক যদি কোন মুসলমানকে আগুনে জ্বালিয়ে দেয় তবে তাকে কি জ্বালিয়ে দেওয়া হবে?

হাদীস নং ২৮০৯

মুআল্লা ইবনে আসাদ রহ……….আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত যে, উকল নামক গোত্রের আট ব্যক্তির একটি দল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এল।

মদীনার আবহাওয়া তারা উপযোগী মনে করেনি। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের জন্য দুগ্ধবতী উটনীর ব্যবস্থা করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা বরং সাদকার উটের পালের কাছে যাও। তখন তারা সেখানে গিয়ে সেগুলোর পেশাব ও দুধ পান করে সুস্থ এবং মোটাতাজা হয়ে গেল।

তারপর তারা উটের রাখালকে হত্যা করে উটের পাল হাঁকিয়ে নিয়ে গেল এবং মুসলামান হওয়ার পর তার মুরতাদ হয়ে গেল। তখন জনৈক সংবাদদাতা রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অশ্বারোহীদের কে তাদের সন্ধানে পাঠালেন।

তখন পর্যন্ত দিনের আলো পূর্ণতা লাভ করেনি। ইতোমধ্যেই তাদেরকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসা হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের হাত পা কেটে ফেললেন।

তারপর তাঁর নির্দেশে লৌহশলাকা উত্তপ্ত করে তাদের চোখে প্রবেশ করানো হয় এবং তাদেরকে প্রস্তরময় উত্তপ্ত ভূমিতে ফেলে রাখা হয়। তারা পানি চেয়েছিল। কিন্তু তাদেরকে পানি দেওয়া হয়নি। অবশেষে তারা মারা যায়।

আবু কিলাব রা. বলেন, (তাদেরকে এরূপ শাস্তি এ জন্য দেয়া হয়েছে যে,) তারা হত্যা করেছে, চুরি করেছে, আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে (ধর্ম ত্যাগী হয়ে) যুদ্ধ করেছে এবং পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ছড়াতে চেষ্টা করেছে।

বুখারি হাদিস নং ২৮১০ – পরিচ্ছেদ ১৮৯৪

হাদীস নং ২৮১০

ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর রহ……….আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, কোন একজন নবীকে একটি পিপিলিকা কামড় দেয়।

তিনি পিপীলিকার সমগ্র আবাসটি জ্বালিয়ে দেয়ার আদেশ করেন এবং তা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি ওহী অবতীর্ণ করেন, তোমাকে একটি পিপিলিকা কামড় দিয়েছে আর তুমি আল্লাহর তাসবীহ পাঠকারী জাতিকে জ্বালিয়ে দিয়েছ।

বুখারি হাদিস নং ২৮১১ – ঘরবাড়ি ও খেজুর বাগান জ্বালিয়ে দেওয়া।

হাদীস নং ২৮১১

মুসাদ্দাদ রহ……….জারীর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি আমাকে যিলখালাসার ব্যাপারে শান্তি দিবে না?

খাশআম গোত্রে একটি মূর্তি ঘর ছিল। যাকে ইয়ামানের কাবা নামে আখ্যায়িত করা হত। জারীর রা. বলেন, তখন আমি আহমাসের দেড়শ অশ্বারোহীর সাথে নিয়ে রওয়ানা করলাম। তারা নিপুন অশ্বারোহী ছিল। জারীর রা. বলেন, আর আমি অশ্বের উপর স্থির থাকতে পারতাম না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে এমনভাবে আঘাত করলেন যে, আমি আমার বুকে তাঁর আঙ্গুলির চিহ্ন দেখতে পেলাম এবং তিনি আমার জন্য এ দু’আ করলেন, হে আল্লাহ! তাকে স্থির রাখুন এবং হিদায়েত প্রাপ্ত, পথ প্রদর্শনকারী করুন।

তারপর জারীর রা. সেখানে গমন করেন এবং যুলখালাসা মন্দির ভেঙ্গে ফেলেন ও জ্বালিয়ে দেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে এ সংবাদ নিয়ে এক ব্যক্তিকে তাঁর নিকট প্রেরণ করেন।

তখন জারীর রা.-এর দূত বলতে লাগল, কসম সে মহান আল্লাহ তাআলার! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি আপনার নিকট তখনই এসেছি যখন যুলখালাসাকে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি।

জারীর রা. বলেন, তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহমাসের অশ্ব ও অশ্বারোহীদের জন্য পাঁচবার বরকতের দু’আ করেন।

 

বুখারি হাদিস নং ২৮১২

হাদীস নং ২৮১২

মুহাম্মদ ইবন কাসীর রহ………..ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাযীর ইয়াহুদীদের খেজুর বাগান জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন।

জিহাদ অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৮১৩ – ঘুমন্ত মুশরিককে হত্যা করা।

হাদীস নং ২৮১৩

আলী ইবনে মুসলিম রহ………বারা ইবনে আযিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারীগণের একটি দল আবু রাফে ইয়াহুদীকে হত্যা করার জন্য প্রেরণ করেন। তাদের মধ্য থেকে একজন এগিয়ে গিয়ে ইয়াহুদীদের দুর্গে ঢুকে পড়ল।

তিনি বলেন, তারপর আমি তাদের পশুর আস্তাবলে প্রবেশ করলাম। এরপর তারা দুর্গের দরজা বন্ধ করে দিল। তারা তাদের একটি গাধা হারিয়ে ফেলেছিল এবং তার খোঁজে তারা বেরিয়ে পড়ে।

আমিও তাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। তাদেরক আমি বুঝতে চেয়েছিলাম যে, আমি তাদের সঙ্গে গাধার খোঁজ করছি। অবশেষে তারা গাধাটি পেল। তখন তারা দুর্গে প্রবেশ করে এবং আমিও প্রবেশ করলাম। রাতে তারা দুর্গের দরজা বন্ধ করে দিল। আর তারা চাবিগুলো একটি কুলুঙ্গির মধ্যে রেখে দিল।

আমি তো দেখতে পাচ্ছিলাম। যখন তারা ঘুমিয়ে পড়ল, আমি চাবিগুলো নিয়ে নিলাম এবং দুর্গের দরজা খুললাম। তারপর আমি আবু রাফের নিকট পৌঁছলাম এবং বললাম, হে আবু রাফে!

সে আমার ডাকে সাড়া দিল। তখন আমি আওয়াজের প্রতি লক্ষ্য করে তরবারীর আঘাত হানলাম, অমনি সে চিৎকার দিয়ে উঠল। আমি বেরিয়ে এলাম। আমি পুনরায় প্রবেশ করলাম, যেন আমি তার সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছি।

আর আমি আমার গলার স্বর পরিবর্তন করে বললাম, হে আবু রাফে! সে বলল, তোমার কি হল, তোমার মা ধ্বংস হোক। আমি বললাম, তোমার কি অবস্থা?

সে বলল, আমি জানি না, কে বা কারা আমার এখানে এসেছিল এবং আমাকে আঘাত করেছে। রাবী বলেন, তারপর আমি আমার তরবারী তার পেটের উপর রেখে সব শক্তি দিয়ে চেপে ধরলাম, ফলে তার হাঁড় পর্যন্ত কট করে উঠল। এরপর আমি ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বের হয়ে এলাম।

আমি অবতরণের উদ্দেশ্যে তাদের সিড়ির কাছে এলাম। যখন আম পড়ে গেলাম, তখন এতে আমার পায়ে আঘাত লাগল। আমি আমার সাথীদের সঙ্গে এসে মিলিত হলাম।

আমি তাদেরকে বললাম, আমি এখান হতে ততক্ষণ পর্যন্ত যাব না, যাবত না আমি মৃত্যুর সংবাদ প্রচারকারীণীর আওয়াজ শুনতে পাই। হিজাযবাসীদের বণিক আবু রাফের মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণা না শোনা পর্যন্ত আমি সে স্থান ত্যাগ করলাম না।

তিনি বলেন, তখন আমি উঠে পড়লাম এবং আমার তখন কোনরূপ ব্যথা বেদনাই অনুভব হচ্ছিল না। অবশেষে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পৌঁছে এ বিষয়ে তাকে সংবাদ দিলাম।

বুখারি হাদিস নং ২৮১৪

হাদীস নং ২৮১৪

আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ রহ……….বারা ইবনে আযিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারীগণের একদলকে আবু রাফে ইয়াহুদীর নিকট প্রেরণ করেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনে আতীক রা. রাত্রিকালে তার ঘরে ঢুকে তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করেন।

জিহাদ অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৮১৫ – তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার আকাঙ্খা পোষণ কর না।

হাদীস নং ২৮১৫

ইউসুফ ইবনে মূসা রহ………উমর ইবনে উবাইদুল্লাহ আযাদকৃত গোলাম আবুন নাযার রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উমর ইবনে উবাদুল্লাহর লেখক ছিলাম। তিনি বলেন, তাঁর নিকট আবদুল্লাহ ইবনে আবু আওফা রা. একখানা পত্র লিখেন। যখন তিনি হারুরিয়ার দিকে অভিযানে বের হন।

আমি পত্রটি পাঠ করলাম–তাঁতে লেখা ছিল যে, শত্রুর সাথে কোন এক মুখোমুখি যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। এরপর তিনি তাঁর সাহাবীদের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, হে লোক সকল! তোমরা শত্রুর সাথে মোকাবেলায় অবতীর্ণ হওয়ার কামনা করবে না এবং আল্লাহ তাআলার নিকট নিরাপত্তার দু’আ করবে।

তারপর যখন তোমরা শত্রুর সম্মুখীন হবে তখন তোমরা ধৈর্যধারণ করবে। জেনে রাখবে, জান্নাত তরবারীর ছায়াতলে অবস্থিত।

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’আ করলেন, হে আল্লাহ, কুরআন অবতরণকারী, মেঘমালা পরিচালনাকারী, সৈন্যদলকে পরাজয় দানকারী, আপনি কাফির সম্প্রদায়কে পরাজিত করুন এবং আমাদেরকে তাদের উপর বিজয় দান করুন।

মূসা ইবনে উকবা রহ. বলেন, সালিম আবুন নাযার আমাকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি উমর ইবনে উবাইদুল্লাহর লেখক ছিলাম।

তখন তার কাছে আবদুল্লাহ ইবনে আবু আওফা রা.-এর একখানা পত্র পৌঁছল এই মর্মে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার আকাঙ্খা করবে না।

আমি আমি রহ. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার আকাঙ্খা করবে না। আর যখন তোমরা তাদের মুখোমুখি হবে তখন ধৈর্যধারণ করবে।

বুখারি হাদিস নং ২৮১৬ – যুদ্ধ হল কৌশল।

হাদীস নং ২৮১৬

আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ রহ……….আবু হুরায়রা রা. সুত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কিসরা ধ্বংস হবে, তারপর আর কিসরা হবে না।

আর কায়সার অবশ্যই ধ্বংস হবে, তারপর আর কায়সার হবে না। এবং এটা নিশ্চিত যে, তাদের ধনভাণ্ডার আল্লাহর রাহে বণ্টিত হবে। আর তিনি যুদ্ধকে কৌশল নামে আখ্যায়িত করেন।

বুখারি হাদিস নং ২৮১৭

হাদীস নং ২৮১৭

আবু বকর ইবনে আসরাম রহ……..আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধকে কৌশল নামে আখ্যায়িত করেছেন। আবু আবদুল্লাহ রহ. বলেন, আবু বকর হলেন বূর ইবনে আসরাম।

জিহাদ অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৮১৮

হাদীস নং ২৮১৮

সাদকা ইবনে ফাযল রহ……….জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যুদ্ধ হল কৌশল।

বুখারি হাদিস নং ২৮১৯ – যুদ্ধে কথা ঘুরিয়ে বলা।

হাদীস নং ২৮১৯

কুতাইবা ইবনে সাঈদ রহ………জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বললেন, কে আছ যে কাব ইবনে আশরাফ-এর (হত্যার) দায়িত্ব নিবে?

কেননা সে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কষ্ট দিয়েছে। মুহাম্মদ ইবনে মাসলাম রা. বলেন, হ্যাঁ।

বর্ণনাকারী বলেন, তারপর মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা রা. কাব ইবনে আশরাফের নিকট গিয়ে বললেন, এ ব্যক্তি অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কষ্টে ফেলেছে এবং আমাদের থেকে সাদকা চাচ্ছে।

বারী বলেন, তখন কাব বলল, এখন আর কী হয়েছে? তোমরা তো তার থেকে আরো অতিষ্ট হয়ে পড়বে। মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা রা. বললেন, আমরা তাঁর অনুসরণ করেছি, এখন তাঁর পরিণতি না দেখা পর্যন্ত তাকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করা পছন্দ করি না।

রাবী বলেন, মুহাম্মদ ইবনে মাসলাম রা. এভাবে তার সাথে কথা বলতে থাকেন এবং সুযোগ পেয়ে তাকে হত্যা করে ফেলেন।

বুখারি হাদিস নং ২৮২০ – হারবীকে গোপনে হত্যা করা ।

হাদীস নং ২৮২০

আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ রহ………জাবির রা. সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কাব ইবনে আশরাফ হত্যা করার দায়িত্ব কে নিবে?

তখন মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা রা. বললেন, আপনি কি এ পছন্দ করেন যে, আমি তাকে হত্যা করি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ।

মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা রা. বললেন, তবে আমাকে অনুমতি দিন, আমি যেন তাকে কিছু বলি । তিনি বললেন, আমি অনুমতি প্রদান করলাম।

বুখারি হাদিস নং ২৮২১ – যুদ্ধক্ষেত্রে কবিতা আবৃত্তি করা ও পরিখা খননকালে স্বর উঁচু করা।

হাদীস নং ২৮২১

মুসাদ্দা রহ……..বারা ইবনে আযিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে খন্দক যুদ্ধের দিন দেখেছি, তিনি স্বয়ং মাটি বহন করেছেন।

এমনকি তাঁর সমগ্র বক্ষদেশের কেশরাজিকে মাটি আবৃত করে ফেলেছে আর তাঁর শরীরে অনেক পশম ছিল। তখন তিনি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা. রচিত কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন: “হে আল্লাহ আপনি যদি আমাদেরকে হিদায়েত না করতেন, তাহলে আমরা হিদায়েত পেতাম না।

আর আমরা সাদকা করতাম না এবং সালাত আদায় করতাম না। আপনি আমাদের প্রতি প্রশান্তি অবতীর্ণ করুন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদেরকে অবিচল রাখুন।

শত্রুগণ আমাদের উপর অত্যাচার চালিয়েছে, যখন তারা ফিতনা সৃষ্টির সংকল্প করেছে, আমরা তা অস্বীকার করেছি”। আর তিনি এ কবিতাগুলো আবৃত্তি কালে স্বর উঁচু করেছিলেন।

বুখারি হাদিস নং ২৮২২ – যে ব্যক্তি ঘোড়ার পিঠে স্থির থাকতে পারে না।

হাদীস নং ২৮২২

মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে নুমাইর রহ……..জারীর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছি তখন থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর কাছে প্রবেশ করতে বাধাঁ দেননি এবং যখনই তিনি আমার চেহারার দিকে তাকাতেন তখন তিনি মুচকি হাসতেন।

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আমার অসুবিধার কথা জানালাম যে, আমি ঘোড়ার পিঠে স্থির থাকতে পারিনা।

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে হাত দিয়ে আঘাত করলেন এবং এ দু’আ করলেন, ‘হে আল্লাহ! তাকে (ঘোড়ার পিঠে) স্থির রাখুন এবং তাকে হিদায়েতকারী ও হিদায়েতপাপ্ত বানান’।

জিহাদ অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৮২৩ – চাটাই পুড়ে যখমের চিকিৎসা করা এবং মহিলা কর্তৃক নিজ পিতার মুখমণ্ডলের রক্ত ধৌত করা, ঢাল ভর্তি করে পানি বহন করে আনা।

হাদীস নং ২৮২৩

আলী ইবনে আবদুল্লাহ রহ……….সাহল ইবনে সাদ সাঈদী রা. থেকে বর্ণিত, তাকে লোকেরা জিজ্ঞাসা করেছিল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যখন কিরূপে চিকিৎসা করা হয়েছিল? তখন সাহল রা. বলেন, এখন আর এ বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক জ্ঞাত কেউ অবশিষ্ট নেই ।

আলী রা. তাঁল ঢালে করে পানি বহন করে নিয়ে আনছিলেন, আর ফাতিমা রা. তাঁর মুখমণ্ডল হতে রক্ত ধৌত করছিলেন এবং একটি চাটাই নিয়ে পোড়ানো হয় আর তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যখমের মধ্যে পুরে দেওয়া হয়।

বুখারি হাদিস নং ২৮২৪ – যুদ্ধক্ষেত্রে ঝগড়া ও মতবিরোধ করা অপছন্দনীয়।

হাদীস নং ২৮২৪

ইয়াহইয়া রহ………..আবু মূসা আশআরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুআয ও আবু মূসা রা.-কে ইয়ামানে প্রেরণ করেন ও নির্দেশ দেন যে, লোকদের প্রতি নম্রতা করবে, কঠোরতা করবে না, তাদের সুসংবাদ দিবে, ঘৃণা সৃষ্টি করবে না। পরস্পর মতৈক্য পোষণ করবে, মতভেদ করবে না।

বুখারি হাদিস নং ২৮২৫

হাদীস নং ২৮২৫

আমর ইবনে খালিদ রহ………বারা ইবনে আযিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহুদ যুদ্ধের দিন আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.-কে পঞ্চাশ জন পদাতিক যোদ্ধার উপর আমীর নিযুক্ত করেন এবং বলেন,

তোমরা যদি দেখ যে, আমাদেরকে পক্ষীকূল ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে, তথাপি তোমরা আমার পক্ষ হতে সংবাদ প্রেরণ করা ব্যতীত স্বস্থান ত্যাগ করবে না।

আর যদি তোমরা দেখ যে, আমরা শত্রু দলকে পরাস্ত করেছি এবং আমরা তাদেরকে পদদলিত করেছি, তখনও আমার পক্ষ হতে সংবাদ প্রেরণ করা ব্যতীত স্বস্থান ত্যাগ করবে না। অনন্তর মুসলমানগণ কাফিরদেরকে যুদ্ধে পরাস্ত করে দিল।

বারা রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি মুশরিকদের মহিলাদেরকে দেখতে পেলাম তারা নিজ পরিধেয় বস্ত্র উপরে উঠিয়ে পলায়ন করেছে। যাতে পায়ের অলঙ্কার ও পায়ের নলা উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছে। তখন আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.-এর সহযোগীগণ বলতে লাগলেন, লোক সকল! এখন তোমরা গনীমতের মাল সংগ্রহ কর।

তোমাদের সাথীরা বিজয় লাভ করেছে। আর অপেক্ষা কিসের? তখন আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে যা বলেছিলেন, তা তোমরা ভুলে গিয়েছো?

তাঁরা বললেন, আল্লাহর শপথ! আমরা লোকদের সাথে মিলিত হয়ে গনীমতের মাল সংগ্রহে অংশগ্রহণ করব। তারপর যখন তাঁরা স্বস্থান ত্যাগ করে নিজেদের লোকজনের নিকট পৌঁছল, তখন (কাফিরগণ কর্তৃক) তাদের মুখ ফিরিয়ে দেয়া হয় আর তাঁরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করতে থাকেন।

এটা সে সময় যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে পেছন থেকে ডাকছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে বারজন লোক ব্যতীত অপর কেউই অবশিষ্ট ছিলনা। কাফিরগণ এ সুযোগ মুসলমানদের সত্তর জনকে বন্দী ও সত্তর জনকে নিহত করেন।

এ সময় আবু সুফিয়ান তিনবার আওয়াজ দিল, লোকদের মধ্যে কি মুহাম্মদ জীবিত আছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উত্তর দিতে নিষেধ করেন।

পুনরায় তিনবার আওয়াজ দিল–লোকদের মধ্যে কি আবু কুহাফার পুত্র (আবু বকর রা.) জীবিত আছে? পুনরায় তিনবার আওয়াজ দিল, লোকদের মধ্যে কি খাত্তাবের পুত্র (উমর রা.) জীবিত আছে? তারপর সে নিজ লোকদের নিকট গিয়ে বলল, এর সবাই নিহত হয়েছে।

এ সময় উমর রা. ধৈর্যধারণ করতে পারলেন না। তিনি বলে উঠলেন, ওহে আল্লাহর শত্রু ! আল্লাহর শপথ! তুমি মিথ্যা বলছো। যাদের তুমি নাম উচ্চারণ করেছো তাঁরা সবাই জীবিত আছেন। তোমাদের জন্য চরম পরিণতি অবশিষ্ট রয়েছে। আবু সুফিয়ান বলল, আজ বদরের দিনের প্রতিশোধ।

যুদ্ধ তো বালতির ন্যায়। তোমরা তোমাদের লোকদের মধ্যে নাক-কান কর্তিত দেখবে, আমি এর আদেশ করিনি কিন্তু তা আমি অপছন্দও করিনি। এরপর বলতে লাগল, হে হুবাল (মূর্তি) তুমি উন্নত শির হও। হে হুবাল! তুমি উন্নত শির হও। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা এর উত্তর দিবে না?

তাঁরা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি বলবে? তিনি বললেন, তোমরা বল, আল্লাহ তাআলাই সর্বোচচ মর্যাদাবান তিনিই মহিমান্বিত।

আবু সুফিয়ান বলল, আমাদের জন্য উযযা (দেবতা) রয়েছে, তোমাদের উযযা নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা বল, আল্লাহ আমাদের সাহায্যকারী বন্ধু তোমাদের কোন সাহায্যকারী বন্ধু নেই।

বুখারি হাদিস নং ২৮২৬ – রাতে যখন (শত্রুর) ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়।

হাদীস নং ২৮২৬

কুতাইবা রহ……….আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাধিক সুন্দর সর্বাধিক দানশীল ও সর্বাধিক শৌর্য-বীর্যের অধিকারী ছিলেন।

আনাস রা. বলেন, একবার এমন হয়েছিল যে, মদীনাবাসী রাতের বেলায় একটি আওয়াজ শুনে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু তালহা রা.-এর গদীবিহীন ঘোড়ায় আরোহণ করে তরবারী ঝুলিয়ে তাদের সম্মুখে এলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা ভয় পেয়ো না, তোমরা ভয় পেয়োনা । তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি এ ঘোড়াটিকে দ্রুতগামী পেয়েছি।

জিহাদ অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৮২৭ – যে ব্যক্তি শত্রু দেখে উচ্চস্বরে বলে, “বিপদ আসন্ন” যাতে লোকদেরকে তা শুনাইতে পারে।

হাদীস নং ২৮২৭

মক্কী ইবনে ইবরাহীম রহ………..সালামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি গাবাহ নামক আমার সাথে স্থানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে বের হলাম। যখন আমি গাবাহর উঁচুস্থানে পৌঁছলাম, সেখানে আমার সাথে আবদুর রাহমান ইবনে আউফ রা.-এর গোলামের সাক্ষাত হল।

আমি বললাম, আশ্চর্য‍! তোমার কি হয়েছে? সে বলল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুগ্ধবতী উটনীগুলো ছিনতাই হয়েছে। আমি বললাম, কারা ছিনতাই করেছে? সে বলল, গাতফান ও ফাযারাহ দুই গোত্রের লোকেরা। তখন আমি বিপদ, বিপদ বলে তিনবার চিৎকার দিলাম।

আর মদীনার দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে যত লোক ছিল সকলকে আওয়ায শুনিয়ে দিলাম। এরপর আমি দ্রুত ছুটে গিয়ে ছিনতাইকারীদের পেয়ে গেলাম।

তারা উটনীগুলোকে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করতে থাকলাম। আর তীর নিক্ষেপ করতে থাকলাম। আর বলতে লাগলাম, আমি আকওয়াযের পুত্র (সালামা) আর আজ কমিনাদের ধ্বংসের দিন। আমি তাদের থেকে উটগুলো ছিনিয়ে নিলাম, তখনও তারা পানি পান করতে পারেনি।

আর আমি সেগুলোকে হাঁকিয়ে নিয়ে আসছিলাম। এ সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমার সাক্ষাত হয়, তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! লোকগুলো পিপাসার্ত।

আমি এত দ্রুততার সাথে কাজ সেরেছি যে, তারা পানি পান করার অবকাশ পায়নি। শীঘ্র তাদের পেছনে সৈন্য পাঠিয়ে দিন। তখন তিনি বললেন, হে ইবনে আকওয়া! তুমি তাদের উপর জয়ী হয়েছ, এখন তাদের ব্যাপারে ছাড়। তারা তাদের গোত্রের নিকট পৌঁছে গেছে, তথায় তাদের আতিথেয়তা হচ্ছে।

বুখারি হাদিস নং ২৮২৮ – তীর নিক্ষেপ কালে যে বলেছে, এটা লও (পানিও না) আমি অমুকের পুত্র।

হাদীস নং ২৮২৮

উবাইদুল্লাহ রহ……….আবু ইসহাক রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বারা ইবনে আযিব রা.-কে জিজ্ঞাসা করল এবং বলল, হে আবু উমারাহ! আপনারা কি হুনাইনের যুদ্ধে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছিলেন? বারা রা. বললেন, (আবু ইসহাক রহ. বলেন) আর আমি তা শুনছিলাম, সেদিন তো রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেননি।

আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস রা. তাঁর খচ্চরের লাগাম ধরেছিলেন। যখন মুশরিকগণ তাকে ঘিরে ফেলল, তখন তিনি অবতরণ করলেন এবং বলতে লাগলেন, আমি আল্লাহর নবী, মিথ্যা নয়।

আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান। তিনি (বারা) রা. বলেন, সেদিন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপেক্ষা সুদৃঢ় আর কাউকে দেখা যায়নি।

বুখারি হাদিস নং ২৮২৯ – শত্রু পক্ষ কারো মিমাংসা মেনে বেরিয়ে আসলে।

হাদীস নং ২৮২৯

সুলাইমান ইবনে হারব রহ…………আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরায়যার ইয়াহুদীরা সাদ ইবনে মুআয রা.-এর মিমাংসায় দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসে, তখন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে পাঠান।

আর তিনি তখন ঘটনাস্থলের নিকটেই ছিলেন। তখন সাদ রা. একটি গাধার পিঠে আরোহণ করে আসলেন। যখন তিনি নিকটবর্তী হলেন, তখন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তোমাদের নেতার প্রতি দণ্ডায়মান হও।

তিনি এসে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বসলেন। তখন তাকে বললেন, এরা তোমরা মীমাংসায় সম্মত হয়েছে।

(কাজেই তুমিই তাদের ব্যাপারে ফয়সালা কর) সাদ রা. বলেন, আমি এই রায় ঘোষণা করছি যে, তাদের মধ্য থেকে যুদ্ধ করতে সক্ষমদেরকে হত্যা করা হবে এবং মহিলা ও শিশুদের বন্দী করা হবে।

রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলার ফয়সালার অনুরূপ ফয়সালাই করেছে।

 

বুখারি হাদিস নং ২৮৩০ – বন্দীকে হত্যা করা হাত পা বেঁধে হত্যা করা।

হাদীস নং ২৮৩০

ইসমাঈল রহ………..আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, মক্কা বিজয়ের বছর রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথায় শিরস্ত্রাণ পরিহিত অবস্থায় প্রবেশ করেন।

যখন তিনি তা খুলে ফেললেন, এক ব্যক্তি এসে বলল, ইবনে খাতাল কাবার পর্দা ধরে জড়িয়ে আছে। রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাকে হত্যা কর।

জিহাদ অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৮৩১ – স্বেচ্ছায় বন্দিত্ব বরণ করবে কি? এবং যে বন্দিত্ব বরণ করেনি আর যে ব্যক্তি নিহত হওয়ার সময় দু’রাকআত (সালাত) আদায় করল।

হাদীস নং ২৮৩১

আবুল ইয়ামান রহ……….আমর ইবনে আবু সুফিয়ান রা. বলেন, রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ ব্যক্তিকে গোয়েন্দা হিসেবে সংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করেন এবং আসিম বিনে সাবিত আনসারীকে তাদের দলপতি নিযুক্ত করেন। যিনি আসিম ইবনে উমর ইবনে খাত্তাবের মাতামহ ছিলেন।

তাঁরা রওয়ানা হয়ে গেলেন, যখন তাঁরা উসফান ও মক্কার মধ্যবর্তী হাদআত নামক স্থানে পৌঁছেন, তখন হুযায়েল গোত্রের একটি প্রশাখা যাদেরকে লেহইয়ান বলা হয় তাদের কাছে তাদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। তারা প্রায় দুশত তীরন্দাজ ব্যক্তিকে তাদের পশ্চাদ্বাবনে প্রেরণ করে।

এরা তাদের চিহ্ন অনুসরণ করে চলতে থাকে। সাহাবীগণ মদীনা থেকে সাথে নিয়ে আসা খেজুর যেখানে বসে খেয়েছিলেন, অবশেষে এরা সে স্থানে সন্ধান পেয়ে গেল, তখন এরা বলল, ইয়াসরিবের খেজুর। তখন তাঁরা একটি উঁচু স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করলেন।

আর কাফিরগণ তাদের ঘিরে ফেলল এবং তাদেরকে বলতে লাগল, তোমরা অবতরণ কর ও স্বেচ্ছায় বন্দিত্ব বরণ কর। আমরা তোমাদের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, তোমাদের মধ্য থেকে কাউকে আমরা হত্যা করব না।

তখন গোয়েন্দা দলের নেতা আসিম ইবনে সাবিত রা. বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তো আজ কাফিদের নিরাপত্তায় অবতরণ করবো না।

হে আল্লাহ! আমাদের পক্ষ থেকে আপনার নবীকে সংবাদ পৌঁছিয়ে দিন। অবশেষে কাফিরগণ তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। আর তারা আসিম রা. সহ সাত জনকে শহীদ করল।

এরপর অবশিষ্ট তিন জন খুবাইব আনসারী, যায়েদ ইবনে দাসিনা রা. ও অপর একজন তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের উপর নির্ভর করে তাদের নিকট অবতরণ করলেন। যখন কাফিররা তাদেরকে আয়ত্বে নিয়ে নিল, তখন তারা তাদের ধনুকের রশি খুলে ফেলে (সেই রশি দিয়ে) তাদের বেঁধে ফেলল।

তখন তৃতীয় জন বলে উঠলেন, সূচনাতেই বিশ্বাসঘাতকা! আমি তোমাদের সাথে যাব না, আমি তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করব, যারা শাহাদাত বরণ করেছেন।

কাফিরগণ তাকে তাদের সঙ্গে টেনে নিয়ে চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি যেতে অস্বীকার করেন। তখন তারা তাকে শহীদ করে ফেলে এবং তারা খুবাইব ও ইবনে দাসিনাকে নিয়ে চলে যায়। অবশেষে তাদের উভয়কে মক্কায় বিক্রয় করে ফেলে। এ বদর যুদ্ধের দিন খুবাইব রা. হারিস ইবনে আমিরকে হত্যা করেছিলেন।

খুবাইব রা. কিছু দিন তাদের নিকট বন্দী থাকেন। ইবনে শিহাব রহ. বলেন, আমাকে উবায়দুল্লাহ ইবনে আয়ায অবহিত করেছেন, তাকে হারিসের কন্যা জানিয়েছে যে, যখন হারিসের পুত্রগণ খুবাইব রা.-কে শহীদ করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিল, তখন তিনি তার নিকট থেকে ক্ষৌর কাজ সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে একটা ক্ষুর ধার চাইলেন।

তখন হারিসের কন্যা তাকে একখানা ক্ষুর ধার দিল। সে (সে বলেছে) সে সময় ঘটনাক্রমে আমার এক ছেলে আমার অজ্ঞাতে খুবাইবের নিকট চলে যায় এবং আমি দেখলাম যে, আমার ছেলে খুবাইবের উরুর উপর বসে রয়েছে এবং খুবাইবের হাতে রয়েছে ক্ষুর। আমি ভয় পেয়ে গেলাম।

খবাইব আমার চেহারা দেখে বুঝতে পারলেন যে, আমি ভয় পাচ্ছি। তখন তিনি বললেন, তুমি কি এ ভয় করো যে, আমি এ শিশুটিকে হত্যা করে ফেলব? কখনো আমি তা করব না।

(হারিসের কন্যা বলল) আল্লাহর কসম! আমি খুবাইবের ন্যায় উত্তম বন্দী কখনো দেখিনি। আল্লাহর শপথ! আমি একদিন দেখলাম, তিনি লোহার শিকলে আবদ্ধ অবস্থায় আঙ্গুর ছড়া থেকে খাচ্ছেন, যা তাঁর হাতেই ছিল। অথচ এসময় মক্কায় কোন ফলই পাওয়া যাচ্ছিল না।

হারিসের কন্যা বলত, এ তো ছিল আল্লাহ তা’আলার পক্ষ হতে প্রদত্ত জীবিকা, যা তিনি খুবাইবকে দান করেছেন। এরপর তারা খুবাইবকে শহীদ করার উদ্দেশ্যে হেরেম থেকে হিল্লের দিকে নিয়ে বের হয়ে পড়ল, তখন খুবাইব রা. তাদের বললেন, আমাকে দু’রাকআত সালাত আদায় করতে দাও।

তারা তাকে সে অনুমতি দান করল। তিনি দু’রাকআত সালাত আদায় করে নিলেন। তারপর তিনি বললেন, তোমরা যদি ধারণা না করতে যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছি তবে আমি সালাতকে দীর্ঘয়িত করতাম। হে আল্লাহ! তাদেরকে এক এক করে ধ্বংস করুন।

তারপর তিনি এ কবিতা দুটি আবৃত্তি করলেন: “যখন আমি মুসলিম হিসাবে শহীদ হচ্ছি তখন আমি কোনরূপ ভয় করি না। আল্লাহর উদ্দেশ্যে আমাকে যেখানেই মাটিতে লুটিয়ে ফেলা হোক না কেন, (তাতে আমার কিছু যায় আসেনা) আমার এ মৃত্যু আল্লাহ তা’আলার জন্যই হচ্ছে।

তিনি যদি ইচ্ছা করেন, তবে আমার দেহের প্রতিটি খণ্ডিত জোড়াসমূহে বরকত সৃষ্টি করে দিবেন”। অবশেষে হারিসের পুত্র তাকে শহীদ করে ফেলে। বন্তুত যে মুসলিম ব্যক্তিকে বন্দী অবস্থায় শহীদ করা হয় তার জন্য দু’রাকআত সালাত আদায়ের এ রীতি খুবাইব রা.-ই প্রবর্তন করে গেছেন।

যে দিন আসিম রা. শাহাদাত বরণ করেছিলেন, সেদিন আল্লাহ তা’আলা তাঁর দু’আ কবুল করেছিলেন। সেদিনই রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবাগণকে তাদের সংবাদ ও তাদের উপর যা যা আপতিত হয়েছিল সবই অবহিত করেছিলেন।

আর যখন কুরাইশ কাফিরদেরকে এ সংবাদ পৌঁছানো হয় যে, আসিম রা.-কে শহীদ করা হয়েছে তখন তারা তাঁর নিকট এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করে, যাতে সে ব্যক্তি তাঁর মরদেহ থেকে কিছু অংশ কেটে নিযে আসে।

যেন তারা তা দেখে চিনতে পারে। কারণ, বদর যুদ্ধের দিন আসমি রা. কুরাইশদের জনৈক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন।

আসিমের মরদেহের (হেফাজতের জন্য) মৌমাছির ঝাঁক প্রেরিত হল (এই মৌমাছিরা) তাঁর দেহ আবৃত করে রেখে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে হেফাজত করল। ফলে তারা তাঁর দেহ হতে কোন এক টুকরা গোশত কেটে নিতে সক্ষম হয়নি।

জিহাদ অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৮৩২ – বন্দীকে মুক্ত করা।

হাদীস নং ২৮৩২

কুতাইবা ইবনে সাঈদ রহ………আবু মূসা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা বন্দীকে মুক্ত কর, ক্ষুধার্তকে আহার দান কর এবং রোগীর সেবা-শুশ্রূষা কর।

বুখারি হাদিস নং ২৮৩৩

হাদীস নং ২৮৩৩

আহমদ ইবনে ইউনুস রহ………..আবু জুহাইফা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আলী রা.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, আল্লাহর কুরআনে যা কিছু আছে তা ছাড়া আপনাদের নিকট ওহীর কোন কিছু আছে কি?

তিনি বললেন, না, সে আল্লাহ তা’আলার কসম! যিনি শস্যদানাকে বিদীর্ণ করেন এবং প্রাণী সৃষ্টি করেন। আল্লাহর কুরআন সম্পর্কে মানুষকে যে জ্ঞান দান করেছেন এবং সহীফার মধ্যে যা রয়েছে, এ ছাড়া আমি আর কিছু জানি না।

আমি বললাম, এ সহীফাটিতে কি আছে? তিনি বললেন, দীয়াতের বিধান, বন্দী মুক্ত করণ এবং কোন মুসলিমকে যেন কোন কাফিরের পরিবর্তে হত্যা করা না হয় (এ সম্পর্কিত নির্দেশ)।

বুখারি হাদিস নং ২৮৩৪ – মুশরিকদের মুক্তিপণ।

হাদীস নং ২৮৩৪

ইসমাঈল ইবনে আবু উয়াইস রহ……….আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, আনসারীগণের কয়েকজন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অনুমতি চেয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ !

আপনি যদি আমাদের অনুমতি দান করেন, তবে আমরা আমাদের ভাগ্নে আব্বাসের মুক্তিপণ ছেড়ে দিতে পারি। রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, একটি দিরহাও ছেড়ে দিবে না।

ইবরাহীম রহ……..আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বাহরাইন থেকে অর্থ-সম্পদ আনা হয়।

তখন তাঁর নিকট আব্বাস রা. এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে কিছু দিন। আমি আমার নিজের মুক্তিপণ আদায় করেছি এবং আকীলেরও মুক্তিপণ আদায় করেছি। তখন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নিয়ে নিন এবং তাঁর কাপড়ে দিয়ে দিলেন।

বুখারি হাদিস নং ২৮৩৫ – মুশরিকদের মুক্তিপণ।

হাদীস নং ২৮৩৫

মাহমুদ রহ……….জুবাইর (ইবনে মুতয়িম) রা. থেকে বর্ণিত, আর তিনি (কাফির থাকা অবস্থায়) বদর যুদ্ধে বন্দীদের মুক্ত করার জন্য (রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট) এসেছিলেন।

তিনি বলেন, আমি রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মাগরিবের সালাতে সূরায়ে তূর পড়তে শুনেছি।

বুখারি হাদিস নং ২৮৩৬ – হারবী (দারুল হারবের অধিবাসী) যদি নিরাপত্তা ব্যতীত দারুল ইসলামে প্রবেশ করে।

হাদীস নং ২৮৩৬

আবু নুআঈম রহ……….সালামা ইবনে আকওয়া রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন এক সফরে মুশরিকদের একদল গুপ্তচর তাঁর নিকট এল এবং তাঁর সাহাবীগণের সঙ্গে বসে কথাবার্তা বলতে লাগল ও কিছুক্ষণ পরে চলে গেল।

তখন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে খুঁজে আন এবং হত্যা কর। রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মালপত্র হত্যাকারীকে দিয়ে দিলেন।

বুখারি হাদিস নং ২৮৩৭ – জিম্মিদের নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধ করা হবে এবং তাদেরকে গোলাম বানানো যাবে না।

হাদীস নং ২৮৩৭

মূসা ইবনে ইসমাঈল রহ……..উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (আমার পর যিনি খলীফা হবেন) আমি তাকে এ অসীয়াত করছি যে, আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পক্ষ থেকে কাফিরদের সাথে কৃত অঙ্গীকার যেন যথাযথভাবে পূরণ করা হয়, তাদের নিরাপত্তার প্রয়োজনে যুদ্ধ করা হয়, তাদের সামর্থ্যের বাইরে তাদের উপর যেন জিযিয়া (নিরাপত্তা কর) ধার্য করা না হয়।

 

জিহাদ অধ্যায় - সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৫ম খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ২৮৩৮ – প্রতিনিধি দলকে উপঢৌকন প্রদান।

হাদীস নং ২৮৩৮

কাবীসা রহ……….ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি (কোন এক সময়) বললেন, বৃহস্পতিবার! হায় বৃহস্পতিবার! এরপর তিনি কাঁদতে শুরু করলেন, এমনকি তাঁর অশ্রুতে (যমিনের) কংকর গুলো সিক্ত হয়ে গেল। আর তিনি বলতে লাগলেন? বৃহস্পতিবারে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোগ যাতনা বেড়ে যায়।

তখন তিনি বললেন, তোমরা আমার জন্য লিখার কোন জিনিস নিয়ে এসো, আমি তোমাদের জন্য কিছু লিখিয়ে দিব। যাতে এরপর তোমরা কখনও পথভ্রষ্ট না হও।

এতে সাহাবীগণ পরস্পরে মতপার্থক্য করেন। অথচ নবীর সম্মুখে মতপার্থক্য সমীচীন নয়। তাদের কেউ কেউ বললেন, রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া ত্যাগ করছেন? তিনি বললেন, আচ্ছা, আমাকে আমার অবস্থায় থাকতে দাও। তোমরা আমাকে যে অবস্থার দিকে আহবান করছ তার চেয়ে আমি যে অবস্থায় আছি তা উত্তম।

অবশেষে তিনি ইন্তিকালের সময় তিনটি বিষয়ে ওসীয়ত করেন। ১. মুশরিকদেরকে আরব উপদ্বীপ থেকে বিতাড়িত কর, ২. প্রতিনিধি দলকে আমি যেরূপ উপঢৌকন দিয়েছি তোমরাও অনুরূপ দিও (রাবী বলেন) তৃতীয় ওসীয়তটি আমি ভুলে গিয়েছি।

আবু আবদুল্লাহ রহ. বলেন, ইবনে মুহাম্মদ রহ. ও ইয়াকুব রহ. বলেন, আমি মগীরা ইবনে আবদুর রহমানকে জাযীরাতুল আরব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বললেন, তা হল মক্কা, মদীনা ইয়ামামা ও ইয়ামান। ইয়াকুব রহ. বলেন, তিহমা আরম্ভ হল আরজ থেকে।

আরও পড়ুনঃ

ক্রয়-বিক্রয় অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৪র্থ খণ্ড

ক্রয়-বিক্রয় অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৪র্থ খণ্ড

ক্রয়-বিক্রয় অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৪র্থ খণ্ড

তারাবীহর সালাত অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৩য় খণ্ড

মদীনার ফযীলত অধ্যায় – সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৩য় খণ্ড

মন্তব্য করুন