আনসারদের মর্যাদা পার্ট ৪ অধ্যায় । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

আনসারদের মর্যাদা পার্ট ৪ অধ্যায়

আনসারদের মর্যাদা পার্ট ৪ অধ্যায় । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

আনসারদের মর্যাদা পার্ট ৪ অধ্যায় । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) – ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৬২৫

হাদীস নং ৩৬২৫

ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর রহ……….নবী সহধর্মিণী আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার মাতা পিতাকে কখনো ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দীন পালন করতে দেখিনি এবং এমন কোন দিন অতিবাহিত হয়নি যেদিন সকালে কিংবা সন্ধ্যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বাড়ীতে আসেননি।

যখন মুসলামানগণ (মুশরিকদের নির্যাতনে) অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেন, তখন আবু বকর রা. হিজরত করে আবিসিনিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। অবশেষে বারকুল গিমাদ (নামক স্থানে) পৌঁছলে ইবনে দাগিনার সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়। সে ছিল তার গোত্রের নেতা।

সে বলল, হে আবু বকর, কোথায় যাচ্ছেন? উত্তরে আবু বকর রা. বললেন, আমার স্বজাতি আমাকে বের করে দিয়েছে। তাই আমি মনে করছি, পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াব এবং আমার প্রতিপালকের ইবাদত করব।

ইবনে দাগিনা বলল, হে আবু বকর রা. আপনার মত ব্যক্তি (দেশ থেকে) বের হতে পারে না এবং বের করাও হতে পারে না। আপনি তো নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করে দেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অক্ষমদের বোঝা নিজে বহন করেন, মেহমানের মেহমানদারী করে থাকেন এবং সত্য পথের পথিকদের বিপদ আপদে সাহায্য করেন।

সুতরাং আমি আপনাকে আশ্রয় দিচ্ছি, আপনাকে সর্বপ্রকার সাহায্য ও সহযোগিতার অঙ্গীকার করছি। আপনি ফিরে যার এবং নিজ শহরে আপনার রবের ইবাদত করুন।

আবু বকর রা. ফিরে এলেন। তাঁর সঙ্গে ইবানে দাগিনাও এল। ইবনে দাগিনা বিকেল বেলা কুরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের নিকট গেল এবং তাদের বলল, আবু বকরের মত লোক দেশ হতে বের হতে পারে না এবং তাকে বের করে দেওয়া যায়না।

আপনারা কি এমন ব্যক্তিকে বের করবেন, যে নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করে দেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অক্ষমদের বোঝা নিজে বহন করেন, মেহমানের মেহমানদারী করে থাকেন ন্যায় পথে থাকার দরুন বিপদ আপদে সাহায্য করেন।

ইবনে দাগিনার আশ্রয়দান কুরাইশগণ মেনে নিল, এবং তারা ইবনে দাগিনাকে বলল, তুমি আবু বকরকে বলে দাও, তিনি যেন তাঁর রবের ইবাদত তাঁর ঘরে করেন।

সালাত তথায়ই আদায় করেন, ইচ্ছা মাফিক কুরআন তিলাওয়াত করেন। কিন্তু এর দ্বারা আমাদের যেন কষ্ট না দেন। আর এসব যেন প্রকাশ্যে না করেন। কেননা, আমরা আমাদের মেয়েদের ও ছেলেদের ফিতনায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করি। ইবনে দাগিনা এসব কথা আবু বকর রা.-কে বলে দিলেন।

সে মতে কিছুকাল আবু বকর রা. নিজের ঘরে তাঁর রবের ইবাদত করতে লাগলেন। সালাত প্রকাশ্যে আদায় করতেন না এবং ঘরেই কোরআন তিলওয়াত করতেন। এরপর আবু বকরের মনে (একটি মসজিদ নির্মাণের কথা) উদিত হল। তাই তিনি তাঁর ঘরের পাশেই একটি মসজিদ তৈরী করে নিলেন।

এতে তিনি সালাত আদায় করতে ও কুরআন পড়তে লাগলেন। এতে তার কাছে মুশরিক মহিলা ও যুবকগণ ভীড় জমাতে লাগল। তারা আবু বকর রা.-এর একাজে বিস্মিত হত এবং তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকত।

আবু বকর রা. ছিলেন একজন ক্রন্দন শীল ব্যক্তি, তিনি যখন কুরআন পড়তেন তখন তাঁর চোখের অশ্রু সামলিয়ে রাখতে পারতেন না। এ ব্যাপারটি মুশরিকদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় কুরাইশদের আতঙ্কিত করে তুলল এবং তারা ইবনে দাগিনাকে ডেকে পাঠান। সে এল।

তারা তাকে বলল, তোমার আশ্রয় প্রদানের কারণে আমরাও আবু বকরকে আশ্রয় দিয়েছিলাম এই শর্তে যে, তিনি তাঁর রবের ইবাদত তাঁর ঘরে করবেন কিন্তু সে শর্ত তিনি লংঘন এবং নিজ গৃহের পাশে একটি মসজিদ তৈরী করে প্রকাশ্যে সালাত ও তিলাওয়াত আরম্ভ করেছেন।

আমাদের ভয় হচ্ছে, আমাদের মহিলা ও সন্তানরা ফিতনায় পড়ে যাবে। কাজেই তুমি তাকে নিষেধ করে দাও। তিনি তাঁর রবের ইবাদত তাঁর গৃহে সীমাবদ্ধ রাখতে পছন্দ করলে, তিনি তা করতে পারেন।

আর যদি তিনি তা অস্বীকার করে প্রকাশ্যে তা করতে তা করতে চান তবে তাকে তোমার আশ্রয় প্রদান ও দায় দায়িত্বকে প্রত্যার্পণ করতে বল। আমরা তোমার আশ্রয় প্রদানের ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা করাকে অত্যন্ত অপছন্দ করি, আবার আবু বকরকেও এভাবে প্রকাশ্যে ইবাদত করার জন্য ছেড়ে দিতে পারিনা।

আয়েশা রা. বলেন, ইবনে দাগিনা এসে আবু রা. কে বলল, আপনি অবশ্যই জানেন যে, কী শর্তে আমি আপনার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলাম। আপনি হয়ত তাকে সীমিত থাকবেন অন্যথায় আমার জিম্মাদারী আমাকে ফিরত দিবেন।

আমি এ কথা আদৌ পছন্দ করিনা যে আমার সাথে চুক্তিবদ্ধ এবং আমার আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার অফবাদ আরববাসীর নিকট প্রকাশিত হউক। আবু বকর রা. তাকে বললেন, আমি তোমার আশ্রয় ফিরিয়ে দিচ্ছি। আমি আমার আল্লাহর আশ্রয়ের উপর সন্তুষ্ট আছি।

এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের বললেন, আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থান (স্বপ্নে) দেখান হয়েছে। সে স্থানে খেজুর বাগান রয়েছে এবং তা দুইটি প্রস্তরময় অবস্থিত। এরপর যারা হিজরত করতে চাইলেন, তা!রা মদীনার দিকে হিজরত করলেন।

আর যারা হিজরত করে আবিসিনিয়ায় চলে গিয়েছিলেন, তাদেরও অধিকাংশ সেখান থেকে ফিরে মদীনায় চল আসলেন। আবু বকর রা. ও মদীনায় দিকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি অপেক্ষা কর। আশা করছি আমাকেও অমুমতি দেওয়া হবে।

আবু বকর রা. বললেন, আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান ! আপনিও কি হিজরতের আশা করছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন আবু বকর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচার্য লাভের জন্য নিজেকে হিজরত থেকে বিরত রাখলেন এবং তাঁর নিকট যে দুটি উট ছিল এ দুটি চার মাস পর্যন্ত (ঘরে রেখে) বাবলা গাছের পাতা (ইত্যাদি) খাওয়াতে থাকেন।

ইবনে শিহাব উরওয়া রা. সূত্রে আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, ইতিমধ্যে একদিন আমরা ঠিক দুপুর বেলায় আবু বকর রা. এর ঘরে বসা ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে আবু বকরকে সংবাদ দিল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা ঢাকা অবস্থায় আসছেন।

আনসারদের মর্যাদা পার্ট ৪ অধ্যায় । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

তা এমন সময় ছিল যে সময় তিনি পূর্বে কখনো আমাদের এখানে আসনেনি। আবু বকর রা তাঁর আগমন বার্তা শুনে বললেন, আমার মাতা-পিতা তাঁর প্রতি কুরবান। আল্লাহর কসম, তিনি এ সময় নিশ্চয় কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কারণেই আসছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৌঁছে (প্রবেশের) অনুমতি চাইলেন। তাকে অনুমতি দেয়া হল। প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরকে বললেন, এখানে অন্য যারা আছে তাদের বের করে দাও ।

আবু বকর রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ‍! আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি কুরবান, এখানেতো আপনারই পরিবার। তখন তিনি বললেন, আমাকেও হিজরতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আবু বকর রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান ! আমি আপনার সফর সঙ্গী হতে ইচ্ছুক।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঠিক আছে। আবু বকর রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমার পিতা-মাতা কুরবান! আমার এ দুটি উট থেকে আপনি যে কোন একটি গ্রহণ করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (ঠিক আছে) তবে মূল্যের বিনিময়ে।

আয়েশা রা. বলেন, আমরা তাদের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা দ্রুততার সহিত সম্পন্ন করলাম এবং একটি থলের মধ্যে তাদের খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুত করে দিলাম।আমার বোন আসমা বিনতে আবু বকর রা তার কোমর বন্ধের কিছু অংশ কেটে সে থলের মুখ বেঁধে দিলেন।

এ কারণেই তাকে জাতুন নেতাক (কোমর বন্ধ বিশিষ্ট) বলা হত। আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর রা. (রওয়ানা হয়ে) সাও পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন। তাঁরা সেখানে তিনটি রাত অবস্থান করলেন। আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা. তাদের পাশেই রাত্রি যাপন করতেন।

তিনি ছিলন একজন তীক্ষ্ম বুদ্ধসম্পন্ন তরুণ। তিনি শেষ রাত্রে ওখান থেকে বেরিয়ে মক্কায় রাত্রি যাপনকারী কুরাইশদের সহিত ভোর বেলায় মিলিত হতেন এবং তাদের দু’জনের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র করা হত তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, ও স্মরণ রাখতেন।

যখন আধার ঘনিয়ে আসত তখন তিনি সংবাদ নিয়ে তাদের উভয়ের কাছে যেতেন। আবু বকর রা.-এর গোলাম আমির ইবনে ফুহাইরা তাদের কাছই দুধালো বকরীর পাল চড়িয়ে বেড়াত।

রাত্রের কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সে বকরীর পাল নিযে তাদের নিকটে যেত এবং তাঁরা দু’জন দুধ পান করে আরামে রাত্রিযাপন করতেন। তাঁরা বকরীর দুধ দোহন করে সাথে সাথেই পার করতেন। তারপর শেষ রাতে আমির ইবনে ফুহাইরা বকরীগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে যেত।

এ তিনটি রাতের প্রত্যেক রাতে সে এরূপই করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর রা. বনী আবদ ইবনে আদি গোত্রের এক ব্যকিএক পারিশ্রমিকের বিনিময়ে খিররীত পথ প্রদর্শক হিসাবে নিযুক্ত কাফির কুরাইশের ধর্মালম্বী।

তাঁরা উভয়ে তাকে বিশ্বস্ত মনে করে তাদের উট দুটি তার হাতে দিয়ে দিলেন এবং তৃতীয় রাত্রের পরে সকালে উট দুটি সাওর গুহার নিকট নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন। আর সে যথা সময়ে তা পৌঁছিয়ে দিল।

আর আমির ইবনে ফুহাইরা ও পথপ্রদর্শক তাদের উভয়ের সঙ্গে চলল। প্রদর্শক তাদের নিয়ে উপকূলের পথ ধরে চলতে লাগল।

ইবনে শিহাব রহ……….বলেন, আবদুর রাহমান ইবনে মালিক মুদলেজ আমাকে বলেছেন, তিনি সুরাকা ইবনে মালিকের ভ্রাতুষ্পুত্র।

তার পিতা তাকে বলেছেন, তিনি সুরাকা ইবনে জুশুমকে বলতে শুনেছেন যে, আমাকে নিকট কুরাইশী কাফিরদের দূত আসল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর রা. এ দুইজনের যে কোন একজনকে যে হত্যা করবে অথবা বন্দী করতে পারবে তাকে (একশ উট) পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিল।

আমি আমার কওম বনী মুদলীজের এক মজলিসে বসা ছিলাম। সে বলল, হে সুরাকা, আমি এই মাত্র উপকূলের পথে কয়েকজন মানুষকে যেতে দেখলাম। আমার ধারণা, এরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সহগামীগণ হবেন। সুরাকা বলেন, আমি বুঝতে পারলাম যে এর তারাই হবেন।

কিন্তু তাকে বললাম, এরা তাঁরা নয়, বরং তুমি অমুক অমুককে দেখেছ। এরা এই মাত্র আমাদের সম্মুখ দিয়ে চলে গেল। তারপর আমি কিছুক্ষণ মজলিসে অবস্থান করে (বাড়ী) চলে এলাম এবং আমার দাসীকে আদেশ করলাম, তুমি আমার ঘোড়াটি বের করে নিয়ে যাও এবং অমুক টিলার আড়ালে ঘোড়াটি ধরে দাঁড়িয়ে থাক।

আমি আমার বর্শা হাতে নিলাম এবং বাড়ীর পিছন দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বর্শাটির এক প্রান্ত হাতে ধরে অপর প্রান্ত মাটি সংলগ্ন অবস্থায় আমি টেনে নিয়ে চলছিলাম ঐ অবস্থায় বর্শার মাটি মাটি সংলগ্ন অংশ দ্বারা মাটির উপর রেখাপাত করতে করতে আমার ঘোড়ার নিকট গিয়ে পৌঁছলাম এবং ঘোড়ায় আরোহণ করে তাকে খুব দ্রুত ছুটালাম।

সে আমাকে নিয়ে ছুটে চলল। আমি প্রায় তাদের নিকট পৌঁছে গেলাম, এমন সময় আমার ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে আমাকে নিয়ে পড়ে গেল। আমিও তার পিঠ থেকে ঠিটকে পড়লাম।

তারপর আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং তুণের দিকে হাত বাড়ালাম এবং তা থেকে তীরগুলি বের করলাম ও তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে ভাগ্য পরীক্ষা করে নিলাম যে আমি তাদের কোন ক্ষতি করতে পারব কি না।

তখন তীরগুলি দুর্ভাগ্যবশত এমনভাবে বেরিয়ে এল যে, ভাগ্য নির্ধারণের বেলায় এমনটি হওয়া পছন্দ করি না। আমি পুনরায় ভাগ্য পরীক্ষায় ফলাফল অমান্য করে অশ্বারোহণ করে সম্মুখ দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম।

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এত নিকটবর্তী হয়ে গেলাম যে তাঁর তিলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তিনি (আমার দিকে) ফিরে তাকাচ্ছিলে কিন্তু আবু বকর রা. বার বার তাকিয়ে দেখছিলেন।

এমন সময় হঠাৎ আমার ঘোড়ায় সামনের পা দুটি হাঁটু পর্যন্ত মাটিতে গেড়ে গেল এবং আমি তার উপর থেকে পড়ে গেলাম।

তখন ঘোড়াটিকে ধমক দিলাম, সে দাঁড়াতে ইচ্ছা করল, কিন্তু পা দুটি বের করতে পারছিল না। অবশেষে যখন ঘোড়াটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠল, তখন হঠাৎ তার সামনের পা দুটি যে স্থানে গেড়ে ছিল সে স্থান থেকে ধুয়ার ন্যায় ধূলি আকাশের দিকে উঠতে লাগল। তখন আমি তীর দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করলাম।

আনসারদের মর্যাদা পার্ট ৪ অধ্যায় । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

এবারও যা আমার অপছন্দনীয় তাই প্রকাশ পেল। তখন উচ্চস্বরে তাদের নিরাপত্তা চাইলাম। এতে তাঁরা থেমে গেলেন এবং আম আমার ঘোড়ায় আরোহণ করে এলাম।

আমি যখন ইত্যাকার অবস্থায় বার বার বাঁধাপ্রাপ্ত ও বিপদে পতিত হচ্ছিলাম তখনই আমার অন্তরে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়েছিল যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ মিশনটি অচিরেই প্রভাব বিস্তার করবে।

তখন আমি তাকে বললাম আপনা কওম আপনাকে ধরে দিতে পারলে একশ উট পুরস্কার ঘোষণা করেছে। মক্কায় কাফেরগণ তাঁর সম্পর্কে যে ইচ্ছা করেছে তা তাকে জানালাম। এবং আমি তাদের জন্য কিছু খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী পেশ করলাম । তাঁরা তা থেকে কিছুই নিলেন না।

আর আমার কাছে এ কথা ছাড়া কিছুই চাইলেন না, আমাদের সংবাদ গোপন রেখ। এরপর আমি আমাকে একটি নিরাপত্তা লিপি লিখে দেওয়ার জন্য তাকে অনুরোধ করলাম। তখন তিনি আমির ইবনে ফুহাইরাকে আদেশ করলেন। তিনি একখন্ড চামড়ায় তা লিখে দিলেন।

তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওয়ানা দিলেন। ইবনে শিহাব রহ বলেন, বলেন, উরওয়া ইবনে যুবাইর রা. আমাকে বলেছেন, পথিমধ্যে যুবাইরের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাত হয়। তিনি মুসলমানদের একটি বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে সিরিয়া থেকে ফিরছিলেন।

তখন যুবাইর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর রা. কে সাদা রঙের পোশাক দান করলেন। এদিকে মদীনায় মুসলিমগণ শুনলেন যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদীনার পথে রওয়ানা হয়েছেন।

তাই তাঁরা প্রত্যহ সকালে মদীনার (বাইরে) হাররা পর্যন্ত গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন, দুপুরে রোদ প্রখর হলে তারা ঘরে ফিরে আসতেন। একদিন তারা পূর্বাপেক্ষা অধিক সময় অপেক্ষা করার পর নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেলেন।

এমন সময় একজন ইয়াহূদী তার নিজ প্রয়োজনে একটি টিলায় আরোহণ করে এদিক ওদিক কি যেন দেখছিল। তখন সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথী সঙ্গীদেরকে সাদা পোশাক পরিহিত অবস্থায় মরীচিকাময় মরুভূমির উপর দিয়ে আগমন করতে দেখতে পেল।

ইয়াহূদী তখন নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল, হে আরব সম্প্রদায়! এইতো সে ভাগ্যবান ব্যক্তি-যার জন্য তোমরা অপেক্ষা করছ।

মুসলিমগণ তাড়াতাড়ি হাতিয়ার তুলে নিয়ে এবং মদীনার হাররার উপকণ্ঠে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গে মিলিত হলেন। তিনি সকলকে নিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে বনী আমর ইবন আউফ গোত্রে অবতরণ করলেন। এদিনটি ছিল রবিউল আউওয়াল মাসের সোমবার।

আবু বকর রা. দাঁড়িয়ে লোকদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব রইলেন।

আনসারদের মধ্য থেকে যারা এ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেন নি তাঁরা আবু বকর রা. এর কাছে সমবেত হতে লাগলেন, তারপর যখন রৌদ্রতাপ নবীজীর উপর পড়তে লাগল এবং আবু বকর রা. অগ্রসর হয়ে তাঁর চাদর দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপর ছায়া করে দিলেন।

তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চিনতে পারল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমর ইবনে আউফ গোত্রে দশদিনের চেয়ে কিছু বেশী সময় অতিবাহিত করলেন এবং সে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা (কুরআনের ভাষায়) তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে সালাত আদায় করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উটে আরোহণ করে রওয়ানা হলেন। লোকেরাও তাঁর সঙ্গে চলতে লাগলেন। মদীনায় (বর্তমান) মসজিদে নববীর স্থানে পৌঁছে উটটি বসে পড়ল।

সে সময় ঐ স্থানে কতিপয় মুসলিম সালাত আদায় করতেন। এ জায়গাটি ছিল আসআদ ইবনে যুরারার আশ্রয়ে পালিত সাহল ও সুহাইল নামক দু’জন ইয়াতীম বালকের খেজুর শুকাবার স্থান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে উটটি যখন এস্থানে বসে পড়ল, তখন তিনি বললেন, ইনশাআল্লাহ, এ স্থানটিই হবে মানযিল।

তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই বালক দুটিকে ডেকে পাঠালেন এবং মসজিদ নির্মাণের জন্য তাদের নিকট জায়গাটি মূল্যের বিনিময়ে বিক্রয়ের আলোচনা করলেন। তারা বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বরং এটি আমরা আপনার জন্য বিনামূল্যে দিচ্ছি।

কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছ থেকে বিনামূল্যে গ্রহণে অসম্মতি জানালেন এবং অবশেষে স্থানটি তাদের থেকে খরীদ করে নিলেন। তারপর সেই স্থানে তিনি মসজিদ নির্মাণ করলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদ নির্মাণকালে সাহাবা কেরামের সঙ্গে ইট বহন করছিলেন এবং ইট বহনের সময় তিনি আবৃত্তি করছিলেন এ বোঝা খায়বারের (খাদ্যদ্রব্য) বোঝা বহন নয়। ইয়া রব, এর বোঝা অত্যন্ত পুণ্যময় ও অতি পবিত্র।

তিনি আরো বলছিলেন, ইয়া আল্লাহ! পরকালের প্রতিদানই প্রকৃত প্রতিদান। সুতরাং আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি অনুগ্রহ করুন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক মুসলিম কবির কবিতা আবৃত্তি করেন, যার নাম আমাকে বলা হয়নি। ইবনে শিহাব রহ. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কবিতাটি ছাড়া অপর কোন পূর্ণাঙ্গ কবিতা পাঠ করছেন বলে কোন বর্ণনা আমার কাছে পৌঁছেনি।

আনসারদের মর্যাদা পার্ট ৪ অধ্যায় । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৬২৬

হাদীস নং ৩৬২৬

আবদুল্লাহ ইবনে আবু শায়বা রহ……….আসমা রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবু বকর রা. যখন মদীনায় যাওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন আমি তাদের জন্য সফরের সফরের খাদ্য সামগ্রী প্রস্তুত করলাম।

আর আমার পিতাকে বললাম, থলের মুখ বেঁধে দেয়ার জন্য আমার কোমরবন্দ ব্যতীত অনু কিছু পাচ্ছি না (এখন কি করি) তিনি বললেন, এটি তুমি টুকরো করে নাও। আমি তাই করলাম। এ কারণে আমার নাম হয়ে গেল, যাতুন নেতাকাইন (কোমরবন্দ দুই ভাগে বিভক্তকারিণী)।

বুখারি হাদিস নং ৩৬২৭

হাদীস নং ৩৬২৭

মুহাম্মদ ইবনে বাশশার রহ……….বারা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বেলন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার দিকে যাচ্ছিলেন তখন সুরাকা ইবনে মালিক ইবনে জুশাম তাঁর পশ্চাদ্বাবন করে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য বদদুআ করলেন। ফলে তার ঘোড়াটি তাকে সহ মাটিতে দেবে গেল। তখন সে বলল, আপনি আল্লাহর কাছে আমার জন্য দু’আ করুন। আমি আপনার কোন ক্ষতি করব না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য দু’আ করলেন।

বর্ণনাকারী বলেন, এক সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিপাসার্ত হলেন। তখন তিনি এক রাখালের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন।

আবু বকর রা. সিদ্দীক রা. বলেন, তখন আমি একটি পেয়ালা নিয়ে এতে কিছু দুধ দোহন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম, তিনি এমনভাবে তা পান করলেন যে, আমি তাঁতে খুশী হলাম।

বুখারি হাদিস নং ৩৬২৮

হাদীস নং ৩৬২৮

যাকারিয়া ইবনে ইয়াহইয়া রহ…………আসমা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তখন তাঁর গর্ভে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর, তিনি বলেন, আমি এমন সময় হিজরত করি যখন আমি আসন্ন প্রসবা। আমি মদীনায় এস কুবাতে অবতরণ করি। এ কুবাই আমি পুত্র সন্তানটি প্রসব করি।

এরপর আমি তাক নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তাঁর কোলে দিলাম। তিনি একটি খেজুর আনালেন এবং তা চিবিয়ে তার মুখে দিলেন। কাজেই সর্বপ্রথম যে বস্তুটি আবদুল্লাহর পাকস্থলীতে প্রবেশ করল তা হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর থুথু।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিবান খেজুরের সামান্য অংশ নবজাতকের মুখের ভিতরের তালুর অংশে লাগিয়ে দিলেন। এরপর তার জন্য দু’আ করলেন এবং বরকত কামনা করলেন।

তিনি হলেন প্রথম নবজাতক সন্তান যিনি (হিজরতের পর) মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। খালিদ ইবনে মাখলাদ রহ. উক্ত রেওয়াত বর্ণনায় যাকারিয়অ ইবনে ইয়াহইয়া রহ. এর অনুসরণ করেছেন।

এতে রয়েছে যে, আসমা রা. গর্ভাবস্থায় হিজরত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসেন।

বুখারি হাদিস নং ৩৬২৯

হাদীস নং ৩৬২৯

কুতাইবা রহ………….আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (মদীনায় হিজরতের পর) মুসলিম পরিবারে সর্বপ্রথম আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরই জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁরা তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন। তিনি একটি খেজুর নিয়ে তা চিবিয়ে তার মুখে দিলেন। সুতরাং সর্বপ্রথম যে বস্তুটি তার পেটে প্রবেশ করল তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর থুথু।

আনসারদের মর্যাদা পার্ট ৪ অধ্যায় । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৬৩০

হাদীস নং ৩৬৩০

মুহাম্মদ রহ……….আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় এলেন তখন উটের পিঠে আবু বকর রা. তাঁর পেছনে ছিলেন।

আবু বকর রা. ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ ও পরিচিত। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন (দেখতে) জাওয়ান এবং অপরিচিত তখন বর্ণনাকারী বলেন, যখন আবু বকরের সঙ্গে কারো সাক্ষাত হত, সে জিজ্ঞাসা করত হে আবু বকর রা. তোমার সম্মুখে বসা ঐ ব্যক্তি কে?

আবু বকর রা. বলতেন, তিনি আমার পথ প্রদর্শক। রাবী বলেন, প্রশ্নকারী সাধারণ পথ মনে করত এবং তিনি (আবু বরক) সত্যপথ উদ্দেশ্যে করতেন।

তারপর একবার আবু বকর রা. পিছনে তাকিয়ে হঠাৎ দেখতে পেলেন একজন অশ্বারোহী তাদের প্রায় নিকটে পৌঁছে গেছে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিছনের দিকে তাকিয়ে দু’আ করলেন, ইয়া আল্লাহ ! আপনি ওকে পাকড়াও করুন।

তৎক্ষণাৎ ঘোড়াটি তাকে নীচে ফেলে দিয়ে দাঁড়িয়ে হ্রেষা রব করতে লাগল। তখন অশ্বারোহী বলল, ইয়া নবী আল্লাহ ! আপনার যা ইচ্ছা আমাকে আদেশ করুন।

তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি সেখানেই থেমে যাও। কেউ আমাদের দিকে আসতে চাইতে তুমি তাকে বাঁধা দিবে। বর্ণনাকারী বলেন, দিনের প্রথম ভাগে ছিল সে নবীর বিরুদ্ধে সংগ্রামকারী আর দিনের শেষ ভাগে হয়ে গেল তাঁর পক্ষ থেকে অস্ত্র ধারণকারী।

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হাররায় একপাশে অবতরণ করলেন। এরপর আনসারদের সংবাদ দিলেন। তাঁরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন এবং উভয়কে সালাম করে বললেন, আপনারা নিরাপদ ও মান্য হিসেবে তাদের বেষ্টন করে চলতে লাগলেন।

মদীনায় লোকেরা বলতে লাগল, আল্লাহর নবী এসেছেন, আল্লাহর নবী এসেছেন, লোকজন উচু জায়গায় উঠে তাদের দেখতে লাগল। আর বলতে লাগল আল্লাহর নবী এসেছেন, আল্লাহর নবী এসেছেন।

তিনি সামনের দিকে চলতে লাগলেন। অবশেষে আবু আইয়ূব রা.-এর বাড়ীর পাশে গিয়ে অবতরণ করলেন। আবু আইয়ূব রা. ঐ সময় তাঁর পরিবারের লোকদের সাথে কথাবার্তা বলছিলেন।

ইতিমধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে সালাম তাঁর আগমনের কথা শুনলেন তখন তিনি তাঁর নিজের বাগানে খেজুর আহরণ করছিলেন। তখন তিনি তাড়াতাড়ি ফল আহরণ করা থেকে বিরত হলেন এবং আহরিত খেজুরসহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে হাযির হলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কিছ কথাবার্তা শুনে নিজ গৃহে ফিরে গেলেন।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাদের লোকগের মধ্যে কার বাড়ী এখান থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী? আবু আইয়ূব রা. বললেন, ইয়া নবী আল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বাড়ী, এই যে তার দরজা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবে চল, আমাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা কর।

তিনি বললেন, আপনারা উভয়েই চলুন। আল্লাহর বরকত দানকারী। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাড়ীতে এলেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা. এসে হাযির হলেন এবং বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপন আল্লাহর রাসূল ; আপনি সত্য নিয়ে এসেছেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ ! ইয়াহূদী সম্প্রদায় জানে যে আম তাদের সর্দার এবং আমি তাদের সর্দারের পুত্র।

আমি তাদের মধ্যে বেশী জ্ঞানী এবং তাদের বড় জ্ঞানীর সন্তান। আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এ কথাটি জানাজানি হওয়ার পূর্বে আপনি তাদের ডাকুন এবং আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করুন, আমার সম্পর্কে তাদের ধারণা অবগত হউন।

কেননা তারা যদি জানতে পারে যে আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, তবে আমার সম্বন্ধে তারা এমন সব অলিক উক্তি করবে যে সব আমার মধ্যে নেই।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ইয়াহূদী সম্প্রদায়কে) ডেকে পাঠালেন। তারা এসে তার কাছে হাযির হল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, ইয়াহূদী সম্প্রদায়, তোমার উপর অভিশাপ ! তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় করে, তিনি ছাড়া তিনি ছাড়া বাবুদ নেই। তোমরা নিশ্চয়ই জান যে আমি সত্য রাসূল।

সত্য নিয়েই তোমাদের নিকট এসেছি। সুতরাং তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। তারা উত্তর দিল, আমরা এসব জানিনা। তারা তিনবার এ কথা বলল।

তারপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা. কেমন লোক? তারা উত্তর দিল, তিনি আমাদের নেতা এবং আমাদের নেতার সন্তান। তিনি আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ আলিম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ আলিমের সন্তান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে তোমাদের মতামত কী হবে?

তারা বলল, আচ্ছা বলতো, যদি তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে তোমরা কী মনে করবে? তারা আবার বলল, আল্লাহ রক্ষা করুন, কিছুতেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করতে পারেন না।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, আচ্ছা বলতো, তিনি যদি মুসলমান হয়েই যান তবে তোমাদের মত কী? তারা বলল, আল্লাহ রক্ষা করুন, তিনি মুসলমান হয়ে যাবেন ইহা কিছুতেই সম্ভব নয়। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ইবনে সালাম, তুমি এদের সামনে বেরিয়ে আস।

তিনি বেরিয়ে আসলেন এবং বললেন, হে ইয়াহূদী সম্প্রদায় ! আল্লাহকে ভয় কর। ঐ আল্লাহর কসম, যদি ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তোমরা নিশ্চয়ই জান তিনি সত্য রাসূল, হক নিয়েই আগমন করেছেন। তখন তারা বলে উঠল, তুমি মিথ্যা বলছ। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বের করে দিলেন।

আনসারদের মর্যাদা পার্ট ৪ অধ্যায় । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৬৩১

হাদীস নং ৩৬৩১

ইবরাহীম ইবনে মূসা রহ………..উমর ইবনে খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি প্রাথমিক পর্যায়ের মুহাজিরদের জন্য চার কিস্তিতে বাৎসরিক চার হাজার দেরহাম ধার্য করলেন, এবং (তাঁর ছেলে) ইবনে উমরের জন্য ধার্য করলেন তিন হাজার পাঁচশ।

তাকে বলা হল, তিনিও তো মুহাজিরদের অন্তর্ভূক্ত। তাঁর জন্য চার হাজার থেকে কম কেন করলেন? তিনি বললেন, সে তো তার পিতা-মাতার সাথে হিজরত করেছে। কাজেই সে ঐ ব্যক্তির সমকক্ষ হতে পারে না যে ব্যক্তি একাকী হিজরত করেছে।

বুখারি হাদিস নং ৩৬৩২

হাদীস নং ৩৬৩২

মুহাম্মদ ইবন কাসীর ও মুসাদ্দাদ রহ……….খাব্বাব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে হিজরত করেছি একমাত্র আল্লাহর তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের জন্য। আমাদের ইহজগতে ভোগ না করে আখিরাতে চলে গিয়েছেন; তন্মধ্যে মুসআব ইবনে উমাইর রা. অন্যতম।

তিনি উহুদ যুদ্ধে শহীদ হন। তাকে কাফন দেয়ার জন্য তার একটি চাদর ব্যতীত আর অন্য কিছুই আমরা পাচ্ছিলাম না। আমরা এ চাদরটি দিয়ে যখন তাঁর মাথা আবৃত করলাম তাঁর পা বের হয়ে গেল আর যখন চাদরটি দিয়ে তাঁর পা ঢাকতে গেলাম তখন মাথা বের হয়ে গেল।

তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের আদেশ করলেন, চাদরটি দিয়ে তাঁর মাথা ঢেকে দাও এবং পা দুটির উপর ইযখির ঘাস রেখে দাও। আর আমাদের মধ্যে এমন রয়েছেন যাদের ফল পেকে গেছে এবং এখন তারা তা আহরণ করছেন।

বুখারি হাদিস নং ৩৬৩৩

হাদীস নং ৩৬৩৩

ইয়াহইয়া ইবনে বিশর রহ………..আবু বুরদা ইবনে আবু মূসা আশআরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. আমাক বললেন, তুমি তুমি কি জান আমার পিতা তোমার পিতাকে কি বলেছিলেন?

আমি বললাম, না । তিনি বললেন, আমার পিতা তোমার পিতাকে বলেছিলেন, হে আবু মূসা তুমি কি ইহাতে সন্তুষ্ট আছ যে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছি, তাঁর সঙ্গে হিজরত করেছি, তাঁর সঙ্গে জিহাদ করেছি এবং তাঁর জীবদ্দশায় কৃত আমাদের প্রতিটি আমল যা করেছি তা আমাদের জন্য সঞ্চিত থাকুক।

তাঁর ওফাতের পর, আমরা যে সব আমল করেছি, তা (জবাবদিহি) আমাদের জন্য সমান সমান, হউক। অর্থাৎ সাওয়াবও না হউক আযাবও না হউক।

তখন তোমার পিতা আবু মূসা রা. বললেন, না (আমি এতে সন্তুষ্ট নেই) কেননা আল্লাহর কসম, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর জিহাদ করেছি, সালাত আদায় করেছি, সাওম পালন করেছি এবং বহু নেক আমল করেছি।

আমাদের হাতে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমরা এসব কাজের সাওয়াব-এর আশা রাখি।

তখন আমার পিতা (উমরা রা.) বললেন, কিন্তু আমি ঐ সত্তার কসম, যার হাতে উমরের প্রাণ রয়েছে, এতেই সন্তুষ্টি যে, (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় তাঁর সাথে কৃত আমল) আমাদের জন্য সঞ্চিত থাকুক আর তাঁর ওফাতের পর আমরা যে সব আমল করেছি তা থেকে যেন আমরা অব্যাহতি পাই সমান সমান ভাবে।

তখন আমি বললাম, আল্লাহর কসম, নিশ্চয়ই তোমার পিতা আমার পিতা থেকে উত্তম।

বুখারি হাদিস নং ৩৬৩৪

হাদীস নং ৩৬৩৪

মুহাম্মদ ইবনে সাববাহ রহ……….আবু উসমান রহ. বলেন, আমি ইবনে উমর রা.-কে বলতে শুনেছি যে, তাকে এ কথা বলা হলে, “আপনি আপনার পিতার আগে হিজরত করেছেন” তিনি রাগ করতেন।

ইবনে উমর রা. বলেন, (প্রকৃত ঘটনা এই যে,) আমি এবং উমর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে হাযির হলাম।

তখন তাকে কায়লুলা অবস্থায় (দুপুরের বিশ্রাম) পেলাম। কাজেই আমরা আমাদের আবাস্থলে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ পর উমর রা. আমাকে পাঠালেন এবং বললেন, যাও গিয়ে দেখ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেগেছেন কিনা? আমি এসে তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম এবং তাঁর কাছে বায়আত করলাম।

তারপর উমর রা. এর কাছে এসে তাকে খবর দিলাম যে, তিনি জেগে গেছেন। তখন আমরা তাঁর নিকট গেলাম দ্রুতবেগে। তিনি তাঁর কাছে প্রবেশ করে বায়আত করলেন। তারপর আমিও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাতে (দ্বিতীয়বার উমর রা.) বায়আত করলাম।

আনসারদের মর্যাদা পার্ট ৪ অধ্যায় । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৬৩৫

হাদীস নং ৩৬৩৫

আহমদ ইবনে উসমান রহ………..আবু ইসহাক রহ. বলেন আমি বারা রা.-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি আবু বকর রা. আমার পিতা আযিব রা.-এর নিকট হাওদা খরীদ করলেন। আমি আবু বকরের সাথে খরীদ হাওদাটি বহন করে নিয়ে চললাম।

তখন আমার পিতা আযিব রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সহিত তাঁর হিজরতের ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তখন আবু বকর রা. বললেন, আমাদের অনুসন্ধান করার জন্য মুশরিকরা লোক নিয়োগ করেছিল।

অবশেষে আমরা রাত্রিকালে বেরিয়ে পড়লাম এবং একরাত ও একদিন অবিরাম চলতে থাকলাম। যখন দুপুর হয়ে গেল, তখন একটি বিরাট পাথর নযরে পড়ল।

আমরা সেটির কাছে এলাম, পাথরটির কিছু ছায়া পড়ছিল। আমি সেখানে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য আমার সঙ্গের চামড়াখানি বিছিয়ে দিলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উপর শুয়ে পড়লেন। আমি এদিক-ওদিক পর্যবেক্ষণ করার জন্য বেরিয়ে পড়লাম।

হঠাৎ এক বকরী রাখালকে দেখতে পেলাম। সে তার বকরীগুলো নিয়ে আসছে। সেও আমাদের মত পাথরের (ছায়ায়) আশ্রয় নিতে চায়। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কার গোলাম? সে বলল, আমি অমুকের। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার বকরীর পালে দুধ আছে কি?

সে বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, তুমি কি (আমাদের জন্য) কিছু দোহন করে দিবে? সে বলল, হ্যাঁ। সে তার পাল থকে একটি বকরী ধরে নিয়ে এল।আমি বললাম, বকরীর স্তন দুটি ঝেড়ে মুছে সাফ করে নাও। সে এক পাত্র ভর্তি দুধ দোহন করল। আমার সাথে একটি পানির পাত্র ছিল।

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য কাপড় দিয়ে তার মুখ বেঁধে ছিলাম। আমি তা থেকে দুধের মধ্যে কিছু পানি ঢেলে দিলাম। ফলে পাত্রের তলা পর্যন্ত শীতল হয়ে গেল। আম তা নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এসে বললাম, পান করুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতখানি পান করলেন যে, আমি সন্তুষ্ট হলাম।

এরপর আমরা রওয়ানা হলাম এবং অনুসন্ধানকারী আমাদের পিছনে ছিল। রাবা রা. বলেন, আমি আবু বকর রা.-এর সঙ্গে তাঁর ঘর প্রবেশ করলাম।

তখন দেখলাম তাঁর মেয়ে আয়েশা রা. বিছানায় শুয়ে আছেন। তাঁর জ্বর হয়েছে। তাঁর পিতা আবু বকর রা.-কে দেখলাম তিনি মেয়ের গালে চুমু খেলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, মা তুমি কেমন আছ?

বুখারি হাদিস নং ৩৬৩৬

হাদীস নং ৩৬৩৬

সুলাইমান ইবনে আবদুর রাহমান রহ………নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খাদেম আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মদীনায়) আগমন করলেন।

এই সময় তাঁর সাহাবীদের মধ্যে সাদা কাল চুল বিশিষ্ট আবু বকর রা. ব্যতীত অন্য কেউ ছিলেন না। তিনি তাঁর চুলে মেহদী ও কতম একত্র করে কলপ (এক প্রকার কালো ঘাস) লাগিয়েছিলেন।

দোহায়েম অন্য সূত্রে আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় এলেন, তখন তাঁর সাহাবীদের মধ্যে আবু বকর রা. ছিলেন সবচে বয়স্ক। তিনি মেহদী ও কতম একত্র করে কলপ লাগিয়েছিলেন। এতে তাঁর সাদা চুল (ও দাঁড়ি ) টকটকে লাল রং ধারণ করেছিল।

আনসারদের মর্যাদা পার্ট ৪ অধ্যায় । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৬৩৭

হাদীস নং ৩৬৩৭

আসবাগ রহ………..আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু বকর রা. কালব গোত্রের উম্মে বাকরা নামে একজন মহিলাকে শাদী করলেন। যখন আবু বকর রা. হিজরত করেন, তখন তাকে তালাক দিয়ে যান। তারপর ঐ মহিলাকে তার চাচাত ভাই শাদী করে নিল।

এই ব্যক্তিটিই হল সেই কবি যে বদর যুদ্ধে নিহত কুরাইশ কাফেরদের শোকগাথা রচনা করেছিল। বদর প্রান্তে কালীব নামক কূপে নিক্ষিপ্ত ঐ সব কাফেরগণ আজ কোথায় যাদের শিযা নামক কাঠের তৈরী খাদ্য-পাত্রে উটের কুজের গোশতে সুসজ্জিত থাকত।

বদরের কালীব কূপে নিক্ষিপ্ত ব্যক্তিগণ আজ কোথায় যারা গায়িকা ও সম্মানিত মদ্যপানকারী নিয়ে নিমগ্ন ছিল। উম্মে বাকরা শান্তির স্বাগত জানাচ্ছে।

আর আমার কাওমের (ধ্বংস হয়ে যাওয়ার) পর আমার জন্য শান্তি কোথায়? রাসূল আমাদের বলেছেন যে, অচিরেই আমাদের জীবিত করা হবে। কিন্তু উড়ে যাওয়া আত্মা ও মাথার খুলীর জীবন আবার কেমন হবে?

বুখারি হাদিস নং ৩৬৩৮

হাদীস নং ৩৬৩৮

মূসা ইবনে ইসামাঈল রহ…………আবু বকর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে (সাওর পর্বতের) গুহায় ছিলাম।

আমি আমার মাথা তুলে উপরের দিকে তাকালাম এবং লোকের পা দেখতে পেলাম। তখন আমি বললাম, ইয়া নবী আল্লাহ ! তাদের কেউ নীচের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই আমাদের দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, হে আবু বকর ! নীরব থাক। আমরা দু’জন আল্লাহ হলেন যাদের তৃতীয়।

বুখারি হাদিস নং ৩৬৩৯

হাদীস নং ৩৬৩৯

আলী ইবনে আবদুল্লাহ রহ……….আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একজন বেদুঈন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে এল এবং তাকে হিজরত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তিনি বললেন, ওহে! হিজরত বড় কঠিন ব্যাপার। এরপর বললেন, তোমার কি উট আছে ? সে বলল, হ্যাঁ।

তিনি বললেন, তুমি কি উটের সাদকা আদায় কর? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তুমি কি উটনীর দুধ অন্যকে পান করতে দাও? সে বলল, হ্যাঁ।

তিনি বললেন, যেদিন পানি পান করানোর উদ্দেশ্যে উটগুলো ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয় সেদিন কি তুমি দুধ দোহন করে (ফকীর মিসকীনদের) দান কর?

সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তবে তুমি সমুদ্রের ওপার থেকেই নেক আমল করতে থাক। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমার আমলের কিছুই হ্রাস করবেন না।

বুখারি হাদিস নং ৩৬৪০ – নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের মদীনায় শুভাগমন।

হাদীস নং ৩৬৪০

আবুল ওয়ালিদ রহ……….বারা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সর্বপ্রথম আমাদের মধ্যে (মদীনায়) আগমন করেন মুসআব ইবনে উমাইর ও ইবনে উম্মে মাকতুম রা.। তারপর আমাদের কাছে আসেন, আম্মার ইবনে ইয়াসির ও বিলাল রা.।

বুখারি হাদিস নং ৩৬৪১

হাদীস নং ৩৬৪১

মুহাম্মদ ইবনে বাশশার রহ…………বারা ইবনে আযিব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সর্বপ্রথম আমাদের মধ্যে (মদীনায়) আগমন করলেন মুসআব ইবনে উমাইর এবং ইবনে উম্মে মাকতুম।

তারা লোকদের কুরআন পড়াতেন। তারপর আসলেন, বিলাল, সাদ ও আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. এরপর উমর ইবনে খাত্তাব রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বিশজন সাহাবীসহ মদীনায় আসলেন। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন।

তাঁর আগমনে মদীনাবাসী যে পরিমাণ আনন্দিত হয়েছিল সে পরিমাণ আনন্দ হতে কখনো দেখিনি। এমনকি দাসীগণও বলছিল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুভাগমন করেছেন।

বারা রা. বলেন, তাঁর আগমনের আগেই মুফাসসালের কয়েকটি সূরাসহ আমি سبح اسم ربك الأعلى সূরা পর্যন্ত পড়ে ফেলেছিলাম।

আনসারদের মর্যাদা পার্ট ৪ অধ্যায় । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) - ৬ষ্ঠ খণ্ড

বুখারি হাদিস নং ৩৬৪২

হাদীস নং ৩৬৪২

আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ রহ……….আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করলেন, তখন আবু বকর ও বিলাল রা. ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। আমি তাদেরকে দেখতে গেলাম এবং বললাম, আব্বাজান, কেমন আছেন?

হে বিলাল, আপনি কেমন আছেন? আবু বকর রা. জ্বরাক্রান্ত হলেই এ পংক্তিগুলো আবৃত্তি করতেন। “প্রতিটি ব্যক্তিকে জিন পরিবারে সুপ্রভাত বলা হয় অথচ মৃত্যু তার জুতার ফিতার চাইতেও অধিক নিকটবর্তী”।

আর বিলাল রা. এর অবস্থা ছিল এই যখন তাঁর জ্বর ছেড়ে যেত তখন কণ্ঠস্বর উচু করে এ কবিতাটি আবৃত্তি করতেন : “হায় আমি যদি জানতাম আমি ঐ মক্কা উপত্যকায় পুনরায় রাত্রি যাপন করতে পারব কিনা যেখানে ইযখির ও জলীল ঘাস আমার চারপাশে বিরাজমান থাকত। হায়, আর কি আমার ভাগ্যে জুটবে যে, আমি মজান্না নামক কূপের পানি পান করতে পারব!

এবং শামা ও তাফিল পাহাড় কি আর আমার দৃষ্টিগোচর হবে”। আয়েশা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে এ সংবাদ জানালাম।

তখন তিনি এ দু’আ করলেন, হে আল্লাহ! মদীনাকে আমাদের প্রিয় করে দাও যেমন প্রিয় ছিল আমাদের মক্কা বরং তার চেয়েও অধিক প্রিয় করে দাও। আমাদের জন্য মদীনাকে স্বাস্থ্যকর বানিয়ে দাও।

মদীনার সা ও মুদ এর মধ্যে বরকত দান কর। আর এখানকার জ্বর রোগকে স্থানান্তর করে জুহফায় নিয়ে যাও।

আরও পড়ুনঃ

আম্বিয়া কিরাম আ অধ্যায় ১ম পার্ট । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৬ষ্ঠ খণ্ড

আম্বিয়া কিরাম আ অধ্যায় ২য় পার্ট । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৬ষ্ঠ খণ্ড

আম্বিয়া কিরাম আ অধ্যায় ৩য় পার্ট । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৬ষ্ঠ খণ্ড

আম্বিয়া কিরাম ৪র্থ পার্ট । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৬ষ্ঠ খণ্ড

আম্বিয়া কিরাম আ অধ্যায় ৫ম পার্ট । সহিহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) । ৬ষ্ঠ খণ্ড

সহিহ বুখারী

মন্তব্য করুন